ইসলামে সদকাতুল ফিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার শেষে ঈদুল ফিতরের আনন্দ যেন সমাজের সব শ্রেণির মানুষ, বিশেষ করে অভাবী ও দুস্থরা সমানভাবে উপভোগ করতে পারে—এই উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ তাআলা ফিতরা ওয়াজিব করেছেন। এটি শুধু দরিদ্রের প্রতি সহমর্মিতা নয়; বরং রোজাদারের রোজায় অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি-বিচ্যুতির পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
বর্তমানে অনেক প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করেও স্বদেশে ফিতরা আদায় করতে চান। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ফিতরা আদায়কারী ব্যক্তি যে দেশে অবস্থান করবেন, সেখানকার দ্রব্যমূল্যের ভিত্তিতেই ফিতরার হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ কেউ যদি সৌদি আরবে অবস্থান করেন এবং বাংলাদেশে ফিতরা পাঠাতে চান, তবে তাঁকে সৌদি আরবের সর্বনিম্ন ফিতরার হার অনুযায়ী অর্থ পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের কম হারে ফিতরা দিলে তা আদায় হবে না—যদি প্রবাসের দেশে তার হার বেশি হয়।
একইভাবে প্রবাসীর নাবালেগ সন্তানদের ফিতরাও পিতার ওপর ওয়াজিব হওয়ায় তাদের ফিতরা পিতার অবস্থানস্থলের মূল্য অনুযায়ী আদায় করতে হবে। তবে প্রবাসীর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা যদি দেশে থাকেন, তাদের ফিতরা দেশের বাজারমূল্য অনুযায়ী দেওয়া বৈধ, কারণ তাদের ফিতরা মূলত তাদের নিজেদের ওপরই আবশ্যক।
আমাদের দেশে অনেকেই সরাসরি চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চান। কিন্তু হাদিস শরিফে চালের উল্লেখ নেই। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পাঁচটি খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে ফিতরা আদায়ের কথা বলেছেন—গম, যব, খেজুর, কিশমিশ ও পনির। যব, খেজুর, কিশমিশ বা পনির দিয়ে আদায় করলে এক ‘সা’ (প্রায় ৩২৭০ গ্রাম) এবং গম দিয়ে আদায় করলে আধা ‘সা’ (প্রায় ১৬৩৫ গ্রাম) দিতে হয়। কেউ যদি চাল দিয়ে দিতে চান, তবে উল্লিখিত দ্রব্যগুলোর যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ চাল দিতে হবে। সরাসরি এক সা’ চাল দিলেই সুন্নাহসম্মতভাবে ফিতরা আদায় হবে না।
অনেকে মনে করেন খাদ্যদ্রব্য ছাড়া টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়া জায়েজ নয়। অথচ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের আমল থেকে জানা যায়, খাদ্যের সমমূল্যের অর্থ দিয়েও ফিতরা আদায় করা বৈধ। অনেক ফকিহের মতে বর্তমান যুগে দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অর্থ দেওয়া অধিক উপযোগী।
ফিতরার ক্ষেত্রে আরেকটি ভুল ধারণা হলো—সবাই শুধু গমের সর্বনিম্ন হার অনুযায়ী ফিতরা দেন। বাস্তবে যার আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তার উচিত কিশমিশ, খেজুর বা পনিরের মূল্যের ভিত্তিতে ফিতরা দেওয়া। সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম দ্রব্যের মূল্য ধরে ফিতরা দেওয়া তাকওয়ার পরিচায়ক।
জাকাত ও ফিতরার নিসাব নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। জাকাত নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের ওপর ফরজ হলেও সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোনো সম্পদের ওপর। ঈদের দিন সকালে যদি কারও কাছে নিসাব পরিমাণ অতিরিক্ত সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। এমনকি কেউ জাকাতের উপযুক্ত না হলেও যদি তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে তাকে ফিতরা গ্রহণ করা বৈধ নয়।
ফিতরা আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের দিন ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে। তবে রমজানের শেষ দশকে বা ঈদের দুই-তিন দিন আগেও তা আদায় করা যায়, যাতে দরিদ্র মানুষ ঈদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারে। কেউ যদি নামাজের আগে দিতে না পারেন, তবে পরে হলেও তা আদায় করতে হবে—কারণ এটি ওয়াজিব হক।
ফিতরা পাওয়ার অধিকারী কেবল অভাবী মুসলমানরা। আত্মীয়দের মধ্যে যারা দরিদ্র—যেমন ভাই, বোন, চাচা বা ফুফু—তাদের দেওয়া উত্তম। এতে সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। তবে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, সন্তান-সন্ততি বা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ফিতরা দিতে পারেন না।
বাড়ির কাজের লোক যদি অভাবী হয়, তাকে ফিতরা দেওয়া যাবে, তবে তা তার পারিশ্রমিক বা বোনাস হিসেবে দেওয়া যাবে না। আবার মসজিদ, মাদরাসা নির্মাণ বা জনকল্যাণমূলক কাজে ফিতরার অর্থ ব্যয় করলে তা আদায় হবে না—কারণ ফিতরার অর্থ সরাসরি গরিবের মালিকানায় পৌঁছানো শর্ত।
কেউ রোজা রাখতে না পারলেও যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব থাকবে। কারণ ফিতরা একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যা রোজা রাখা বা না রাখার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
বর্তমান সময়ে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো ডিজিটাল মাধ্যমে ফিতরা পাঠানো যায়। তবে ‘ক্যাশ আউট’ চার্জ দাতাকেই বহন করতে হবে, যাতে ফিতরার পুরো টাকা দরিদ্র ব্যক্তির হাতে পৌঁছায়।
সদকাতুল ফিতর আমাদের ইবাদতের ত্রুটি দূর করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের মুখে ঈদের হাসি ফোটায়। তাই সঠিক মাসআলা জেনে বিশুদ্ধ নিয়তে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তমভাবে এই ওয়াজিব ইবাদত আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

