Tuesday, November 3

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। চারটি বিয়ার পান করে উত্তরার একটি বার থেকে বের হওয়ার পর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়ে তিনি যান টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায়। সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচির একপর্যায়ে তাদের ধাওয়া করা হয় বলে দাবি করেছেন দীপ। তার ভাষ্য, ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি নিজে আশ্রয় নেন একটি পিলারের পাশে। পরদিন নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাহসিফের মরদেহ।

বারের আড্ডা থেকে বস্তিতে যাত্রা, সেখানে ধাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত নদে মৃত্যুর ঘটনা—কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব বিষয় নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কেন গভীর রাতে তারা বস্তিতে গিয়েছিলেন, কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কী পরিস্থিতিতে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, তা জানতে কাজ করছেন তদন্তকারীরা। সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ফরেনসিক পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার সূত্র খোঁজা হচ্ছে।

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রবেশ করেন তাহসিফ, তার বন্ধু দীপ ও বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশা। মোটরসাইকেলে পৌঁছে তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে ঢোকেন। অন্য একটি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দিশাকে লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে আসেন দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর, রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই রাতে তাহসিফ ১৬ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত চারটি ‘আল্ট্রা স্ট্রং’ বিয়ার পান করেন। তবে এতটা পান করার পরও তার মধ্যে দৃশ্যমান নেশার লক্ষণ ছিল না বলে দাবি সূত্রটির। সেদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন তাহসিফ। বারে স্যাড মিউজিক বাজানোর অনুরোধও করেছিলেন তিনি। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দিশার সঙ্গে অন্য এক তরুণের সময় কাটানো নিয়ে তার মধ্যে ক্ষোভ ছিল।

একটি সূত্রের ভাষ্য, তাহসিফ ও দিশার মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। কোনো একটি বিষয় নিয়ে সেদিন তাদের মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে দিশাকে তাহসিফ বলেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি।’ তবে কী ঘটনার পর তিনি এ কথা বলেছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের জেনারেল ম্যানেজার ও সাবেক মেরিটাইম ক্যাপ্টেন হাসান হাবিব জানান, তাহসিফ শেষবার যেদিন সেখানে যান, সেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে এর আগের তিন দিন সাউরী একই তরুণীকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে দীপ ও অন্য এক তরুণীও ছিলেন। হাসান হাবিবের ভাষ্য, তারা গান শুনেছেন, নাচ করেছেন এবং সময় কাটিয়েছেন। আগের একদিন তাহসিফের সঙ্গে তার পরিচয় ও কথা হয়েছিল। তখন তাহসিফ নিজেকে ৭৭ লং কোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য গ্রুপে আন্ডারকভার হিসেবে কাজ করছেন বলে জানিয়েছিলেন।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তির দিকে রওনা হন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে তারা মাজার রোড দিয়ে বস্তি এলাকায় প্রবেশ করেন। অন্য একটি ফুটেজে দুজন করে আরোহী নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলকে একসঙ্গে এলাকায় ঢুকতে দেখা যায়। প্রথম মোটরসাইকেলে ছিলেন তাহসিফ।

কেন গভীর রাতে তারা ওই এলাকায় গিয়েছিলেন, সেটি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তুরাগ নদসংলগ্ন ওই এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে। সেখানে ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের তথ্যও তদন্তে এসেছে। তবে তাহসিফ সেখানে গিয়ে কোনো মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর আগে তিনি অ্যালকোহল কিংবা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, বস্তিতে অবস্থানের সময় তাহসিফ উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। একপর্যায়ে মাদকসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে আসেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কী নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, কারা ধাওয়া করেছিলেন এবং তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে তাদের আগে থেকে কোনো পরিচয় বা বিরোধ ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দাবি, ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি নিজে একটি পিলারের পাশে লুকিয়ে থাকেন। পরে টহলরত পুলিশ সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাহসিফের সঙ্গে সেখানে আসার কথা জানান। দীপের ভাষ্য, পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। তবে বস্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেতে তার বেশ সময় লাগে। পরে মূল সড়কে উঠে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় চলে যান।

দীপের এই বক্তব্য নিয়ে তদন্তকারীদের একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেননি কেন? ধাওয়ার সময় বন্ধুকে একা ফেলে তিনি কেন আত্মগোপন করেছিলেন? কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কী কারণে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল?

নৌ-পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তবে ঘটনার শুরুতে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী বক্তব্যে কিছু পরিবর্তন পাওয়া গেছে। এ কারণে তার বক্তব্য সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য ও অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই রাতে বস্তি এলাকায় দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছে। টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, ওই এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা সেখানে ডিউটি করেন।

তাহসিফের সঙ্গে বারে যাওয়া জেরিকা তাসনিম দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, বারে যাওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে কোথায় দেখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, বারে বসে কী আলোচনা হয় এবং রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না। দিশার বক্তব্যের সঙ্গে আগে রিমান্ডে থাকা দীপের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাদের বক্তব্যে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তা তদন্তে নতুন সূত্র দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাহসিফের সঙ্গে দিশার সম্পর্কের টানাপোড়েন, বারে তাদের কথোপকথন এবং বার ছাড়ার পরের ঘটনাপ্রবাহ এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় তার পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি রক্ত ও ভিসেরার নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, পানিতে ডুবেই তাহসিফের মৃত্যু হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন এবং পানিতে পড়ার পর তার শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

নৌ-পুলিশের এসপি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখন পর্যন্ত অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে সব বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা যাবে না।

তাহসিফের শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহে তিনটি স্থান এখন তদন্তের কেন্দ্রে—উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এবং তুরাগ নদ। বারে তাহসিফ, দীপ ও দিশার উপস্থিতি সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে তাহসিফ ও দীপের বস্তিতে যাওয়ার বিষয়টিও ফুটেজে মিলেছে। কিন্তু বস্তিতে গিয়ে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কীভাবে তাহসিফ নদে পড়লেন, সেই অংশ এখনো অস্পষ্ট।

তদন্তে আপাতত সামনে এসেছে চার বিয়ার পান, প্রেমিকার সঙ্গে মনোমালিন্য, গভীর রাতে বস্তিতে যাত্রা, চিৎকার-চেঁচামেচি, ধাওয়া এবং নদে ঝাঁপ দেওয়ার দাবি। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র কী, তা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তাহসিফ কি ধাওয়ার মুখে প্রাণ বাঁচাতে নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, নাকি পানিতে পড়ার পেছনে ছিল অন্য কোনো ঘটনা? আর তার বন্ধু দীপের বক্তব্যে যে অসংগতি পাওয়া গেছে, তার ব্যাখ্যাই বা কী? তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, দুই সঙ্গীর জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন মিলিয়ে শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। উত্তরার বার থেকে তুরাগ নদ পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই লুকিয়ে আছে সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের মৃত্যুর রহস্য।

Leave A Reply


Math Captcha
50 − 49 =