Thursday, October 22

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফুটপাত দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ এবং অস্ত্রের মহড়াসহ নানা অপরাধে একাধিক গ্যাংয়ের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

স্থানীয় লোকজন, ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটপাতের দোকান, মাদকের স্পট, পরিবহন, ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ এবং বাসাবাড়ির ময়লা ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার হলেও অনেক সদস্য জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের অনেক পৃষ্ঠপোষক এলাকা ছেড়ে গেলেও গ্যাংগুলোর তৎপরতা বন্ধ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বরং নিজেদের অপরাধলব্ধ অর্থে তারা অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফুটপাতের দোকান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ

গত ১৫ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের বসিলা সড়কের ময়ূর ভিলার সামনে দুই হকারকে গুলি ও ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এর পেছনে রয়েছে রায়েরবাজারের সাব্বির গ্রুপ।

এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশিনগর এলাকায় রায়েরবাজারের পাটালি গ্রুপের একাংশের নেতা ফরহাদ খুন হন। স্থানীয়দের ভাষ্য, বসিলা সড়কে ফরহাদের প্রায় ৩০টি দোকান ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ সাব্বির গ্রুপের হাতে যায়। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় ফরহাদের বোনজামাই মো. সুমন ও ভাগ্নে ফাহিম হামলার শিকার হন। ওই হামলায় সুমনের পায়ে গুলি করা হয় এবং ফাহিমকে ছুরিকাঘাত করা হয়।

স্থানীয়দের দাবি, বসিলা সড়কের প্রায় ১৭০টি ফুটপাতের দোকান বিভিন্ন গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব দোকান থেকে দৈনিক চাঁদা আদায় করা হয়। দোকানের অবস্থান অনুযায়ী প্রতিটি থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নেওয়া হয়। মাছের দোকান থেকে আদায় করা হয় ৫০০ টাকা করে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিছুদিন চাঁদা দিতে হয়নি। পরে হুমকি ও অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আবার চাঁদা আদায় শুরু হয়। চাঁদাবাজির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ ওঠা শরীফ বাদল ওরফে কাইল্লা বাদল সম্প্রতি চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাদকের অন্তত ১০টি স্পট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় কবজি কাটা গ্রুপের বিরুদ্ধে মাদকের অন্তত ১০টি স্পট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গ্রুপটির অনেক সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও তাদের অনেকে কারাগার থেকে বেরিয়ে আবার তৎপর হয়েছে।

আদাবর, শেখেরটেক, সুনিবিল, হাড্ডিপট্টি, তুরাগ হাউজিং, নবোদয় হাউজিংয়ের নয়তলা এলাকা, নবীনগরের বিভিন্ন অংশ এবং চন্দ্রিমা হাউজিংয়ে মাদকের স্পটগুলো এই গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

এদিকে বেড়িবাঁধ সড়কে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দেয়ালসংলগ্ন অন্তত ১৭টি নার্সারি, আটটি রিকশার গ্যারেজ ও অটোস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে কয়েকটি গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিটি নার্সারি থেকে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং গ্যারেজ থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।

রায়েরবাজারের পাবনা হাউস গলি ও ক্যানসার গলি এলাকায় মাদকের হাট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকায় অস্ত্রধারী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পাহারা দেয়। সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ একাধিকবার হামলা ও বাধার মুখে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গণপরিবহন ও বিভিন্ন ব্যবসায় চাঁদাবাজি

পরিবহন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মোহাম্মদপুর থেকে চলাচল করা একাধিক বাস ও লেগুনা রুটে চাঁদাবাজি চলছে। বিভিন্ন পরিবহনস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি গ্যাং। মোহাম্মদপুর থেকে বাড্ডার নতুন বাজার, ফার্মগেট, শ্যামলী, উত্তরা ও জুরাইন রুটের পরিবহন ঘিরেও নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদপুর ও আদাবরের রিং রোড, শিয়া মসজিদ, কৃষি মার্কেট, শেখেরটেক, জাপান গার্ডেন সিটি ও টোকিও স্কয়ারসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত নিয়েও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

কৃষি মার্কেট এলাকার ফুটপাত ও বাজারকেন্দ্রিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠা বিএনপি নেতা মীর কামাল হোসেন তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি ফুটপাত, ময়লার ব্যবসা বা হাটের সঙ্গে জড়িত নন এবং তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করা কেউ অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত নন। অন্য কয়েকজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, কয়েক দিন আগে বাবা ও ছেলের ওপর হামলার ঘটনার পর বসিলা সড়কে দোকান বসতে দেওয়া হচ্ছে না। সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদ করে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে ওই এলাকায় ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের অংশজুড়ে দোকান দেখা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা প্রদর্শন ও অনৈতিক কাজে ব্যবহার করেন। এতে অপরাধের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা তৈরি হয়। তাঁর মতে, অপরাধীদের পাশাপাশি আড়াল থেকে মদদ দেওয়া ব্যক্তিদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মাদক ও অস্ত্রের কারবার এবং কিশোর অপরাধীদের মদদদাতাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য থাকার কথা। অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হলে বিষয়টি জনসমক্ষে স্পষ্ট হবে।

এদিকে গত সোমবার নারায়ণগঞ্জে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অপরাধী যে মত, বর্ণ বা ধর্মেরই হোক কিংবা যত ক্ষমতাশালীই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 54 = 56