Thursday, November 5

পুরের খাবারের অপেক্ষায় ক্যান্টিনে বসে শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও খাবার আসছে না। কোথাও আবার আগের মতো মিলছে না পছন্দের পদ, থাকছে না নাশতার আইটেমও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর ক্যান্টিনে গ্যাস সংকটের কারণে লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। এতে খাবারের মান, পদসংখ্যা ও পরিবেশনের সময়ের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। একই সঙ্গে বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ক্যান্টিন ও ডাইনিং ঘুরে এবং ক্যান্টিন পরিচালক, শিক্ষার্থী ও ডাকসু নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক ক্যান্টিনে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রতিদিন দুই থেকে তিন মণ লাকড়ি

বিজয় একাত্তর ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক তৌহিদ জানান, প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন রান্নার জন্য দুই থেকে তিন মণ লাকড়ি কিনতে হচ্ছে। এতে মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

তৌহিদের ভাষ্য, লাকড়ি কিনতে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা খাবারের মান উন্নয়নে ব্যয় করা গেলে খাবারের মান আরও ভালো করা সম্ভব হতো। লাকড়িতে রান্নার কারণে খাবার পরিবেশনেও দেরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্যাসে যে ভাত আধা ঘণ্টায় রান্না করা যেত, লাকড়িতে এখন তা রান্না করতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগছে।

একাধিক ক্যান্টিন পরিচালক আশঙ্কা করছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এই বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়লে খাবারের দাম সমন্বয় করতে হতে পারে। অন্যথায় ক্যান্টিন পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে বলে দাবি তাদের।

বাড়তি খরচের চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর

ক্যান্টিন পরিচালকদের বাড়তি জ্বালানি খরচ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও। তাদের অভিযোগ, লাকড়িতে রান্নার কারণে খাবারের মান আগের মতো থাকছে না। রান্নায় বেশি সময় লাগায় নির্ধারিত সময়েও খাবার পাওয়া যাচ্ছে না।

জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ক্যান্টিন মালিকরা অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ নিজেদের পকেট থেকে দীর্ঘদিন বহন করবেন না। শেষ পর্যন্ত খাবারের দাম বাড়িয়ে এর চাপ শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়তে পারে।

হলের ভিপি মাহবুব তালুকদার বলেন, জ্বালানি সংকটের পুরো চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর না দিয়ে সংকটকালীন সময়ে ক্যান্টিনগুলোকে সাময়িক জ্বালানি ভর্তুকি দেওয়া উচিত। তা না হলে ক্যান্টিন পরিচালকদের জন্য ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

ভর্তুকি চায় ডাকসু

গ্যাস সংকটের কারণে ক্যান্টিনগুলোর বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।

ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ক্যান্টিনগুলোর বাড়তি খরচ হচ্ছে। সংকটকালীন সময়ে ক্যান্টিনগুলোকে ভর্তুকি দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে বলা হয়েছে।

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। উপাচার্য ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি সমাধানে চেষ্টা করছেন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এসএম ফরহাদ বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা না হলে ডাকসু ভিন্ন কর্মসূচিতে যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের এই সংকট দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

তিতাসকে চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী কাজী আকরাম হোসেন জানান, গ্যাস সংকটের বিষয়টি জানিয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার বিষয়টি জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, এটি জাতীয় সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এককভাবে এ সংকট সমাধানের সুযোগ সীমিত। এর সমাধান জাতীয় পর্যায়েই করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা হলেও শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে হলগুলোর ক্যান্টিনে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রকৌশল দপ্তরের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে। সংকট আরও বাড়লে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট

গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ও একাডেমিক ভবনে বিদ্যুৎবিভ্রাটও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তীব্র গরমের মধ্যে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা।

আবাসিক হলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হলভেদে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, স্যার এ এফ রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ও শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যুৎবিভ্রাটের কথা জানিয়েছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. মাসুদুজ্জামান বলেন, গত পাঁচ বছরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন লোডশেডিং দেখেননি তিনি। আগে বিদ্যুৎ চলে গেলে যান্ত্রিক ত্রুটি বলে মনে হতো। এখন প্রতিদিন কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে রিডিং রুমে পড়াশোনা করা এবং রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ব্যাহত হচ্ছে।

শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী তাসফিয়া সুলতানাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, প্রায় তিন বছর হলে থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া কয়েক মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ চলে যেতে দেখেননি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে।

বিদ্যুৎবিভ্রাটের প্রভাব আবাসিক হলের বাইরেও পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক একাডেমিক ভবনে ক্লাস চলাকালে বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম ও স্মার্ট ক্লাসের বিভিন্ন সরঞ্জাম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে ফ্যান বন্ধ থাকায় শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

দ্রুত সমাধানের আশ্বাস প্রশাসনের

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যুৎ ফেজের আওতায় থাকায় সব এলাকায় একই ধরনের লোডশেডিং হচ্ছে না।

তিনি জানান, লোডশেডিংয়ের বিষয়টি নিয়ে ডিপিডিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও চলমান পরীক্ষা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যতটা সম্ভব নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

প্রশাসন আশা করছে, দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

Leave A Reply


Math Captcha
63 − 55 =