রাজধানীর ধানমণ্ডি লেকে রবীন্দ্রসরোবরের আদলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নতুন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রাথমিকভাবে ‘নজরুলসরোবর’, ‘নজরুল মঞ্চ’ কিংবা ‘বিদ্রোহী চত্বর’—এ ধরনের নাম বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
নতুন এই সাংস্কৃতিক স্থাপনা নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ধানমণ্ডি লেকের সংস্কার, সৌন্দর্যায়ন ও পরিবেশ উন্নয়নে আরও ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে লেকটির উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৭৫ কোটি টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় ধানমণ্ডি লেকের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ৫০ কোটি এবং সাংস্কৃতিক স্থাপনা নির্মাণের জন্য ২৫ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির বিস্তারিত নকশা, বাস্তবায়ন কাঠামো ও চূড়ান্ত ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি।
ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, ‘নজরুলসরোবর’ নির্মাণের জন্য বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পর বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
ধানমণ্ডি-৩২ থেকে ‘সাম্পান’ পর্যন্ত সম্ভাব্য স্থান
প্রাথমিক পরিকল্পনায় ধানমণ্ডি-৩২ থেকে ‘সাম্পান’ পর্যন্ত লেকের অংশকে নতুন সাংস্কৃতিক পরিসরের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে ধানমণ্ডি-১৫/এ এলাকাকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পরে স্থান পরিবর্তনের চিন্তা করা হয়। তবে বর্তমান স্থানটিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ডিএসসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি শুধু একটি মঞ্চ হবে না; বরং ধানমণ্ডি লেককেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক ও নাগরিক পরিসর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস, বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের অবসরযাপন ও বিনোদনের সুযোগ থাকবে।
ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ধানমণ্ডি লেককে আরও নান্দনিক ও আকর্ষণীয় করে তুলতে ধাপে ধাপে কাজ করা হচ্ছে। ‘নজরুলসরোবর’ বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি জলাধারকেন্দ্রিক বিনোদনকেন্দ্র নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠবে।
রবীন্দ্রসরোবরের আদলে নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর
রাজধানীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম পরিচিত স্থান রবীন্দ্রসরোবর। ধানমণ্ডি লেক সংস্কারের সময় ১৯৯৬ সালে স্থপতি ইকবাল হাবিবের নেতৃত্বে নগরবাসীর বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য এটি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক আয়োজনের অন্যতম জনপ্রিয় স্থান হয়ে ওঠে রবীন্দ্রসরোবর।
সেই আদলেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নতুন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ডিএসসিসি। এর মাধ্যমে নজরুলের সাহিত্য, সংগীত, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে নগরজীবনের সাংস্কৃতিক পরিসরের আরও ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ধানমণ্ডি লেকে রবীন্দ্রসরোবরের আদলে নজরুলসরোবর নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তবে ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উদ্যোগটি আর এগোয়নি। এবার নতুন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৮৬ একর লেক ঘিরে বড় পরিকল্পনা
প্রায় ৮৬ একর আয়তনের ধানমণ্ডি লেক রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবুজ ও জলাধারভিত্তিক নাগরিক পরিসর। প্রতিদিন নগরবাসীর একটি বড় অংশ এখানে হাঁটাচলা, শরীরচর্চা, অবসর ও বিনোদনের জন্য আসে।
লেকটির সংস্কার, সৌন্দর্যায়ন এবং নতুন সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ধানমণ্ডি লেকের নাগরিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করছে ডিএসসিসি।
তবে ‘নজরুলসরোবর’ এখনো চূড়ান্ত প্রকল্প নয়। স্থান, নকশা, ব্যয় বিভাজন ও বাস্তবায়ন সময়সূচি নিয়ে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া বাকি। ফলে ২৫ কোটি টাকার প্রাথমিক পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা পরিবর্তিত হবে, সেটি প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা ও বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।

