ধাক্কাধাক্কি, বসার জায়গা না পাওয়া আর পুরুষ সহযাত্রীর কনুইয়ের গুঁতো ঢাকার গণপরিবহনে নারীদের নিত্যদিনের ভোগান্তির অংশ। এসব বিড়ম্বনা এড়িয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশায় নারীদের জন্য বিশেষায়িত ‘গোলাপি বাস’ চালু হলেও শুরুতেই এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৮ আগস্ট চালু হওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) এই বিশেষ বাস সার্ভিসে বর্তমানে ঢাকায় ১০টি বাস চলছে। প্রতিটি বাস দিনে মাত্র দুটি ট্রিপ দেওয়ায় যাত্রীদের বড় একটি অংশ প্রয়োজনের সময় এই বাস পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে নারীরা বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন, অন্যদিকে অনেক সময় বাসগুলোও তুলনামূলক ফাঁকা অবস্থায় চলাচল করছে।
গতকাল বিকাল ৫টার দিকে মতিঝিল রাজউক অ্যাভিনিউ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সচিবালয় থেকে তালতলাগামী একটি ‘গোলাপি বাস’ ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। বাসটি বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে ছাড়ে। তখন দোতলা বাসটির নিচতলায় ১৪ জন এবং ওপরতলায় মাত্র তিনজন যাত্রী ছিলেন। অথচ নিচতলায় ৩২টি ও ওপরতলায় ৪৫টি আসন রয়েছে। তবে মতিঝিল এলাকায় পৌঁছানোর পর যাত্রীর সংখ্যা কিছুটা বাড়ে।
বাসটির নারীচালক এস কে ফাহিমা সানজা কথা বলতে রাজি হননি। বিআরটিসির পক্ষ থেকে চালকদের কথা বলার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে চালকের সহকারী হনুফার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকেই নারীদের জন্য বরাদ্দ বাসে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন অন্তঃসত্ত্বা যাত্রী বাসে উঠলে তাঁকে বসার জায়গা করে দিতে অন্য যাত্রীদেরও অনুরোধ করেন তিনি।
যাত্রীদের একজন মুগদার বাসিন্দা জান্নাত। তিনি দুজনকে সঙ্গে নিয়ে ‘গোলাপি বাস’ দেখতে এসেছেন। জনতা ব্যাংকে কর্মরত আরেক যাত্রী জানান, আগে নারী বাস থাকলেও লাল রঙের কারণে সেগুলো আলাদাভাবে চেনা যেত না। এখন গোলাপি রঙ হওয়ায় সহজেই চেনা যায়। সারা দেশে এ ধরনের বাস চালু করা হলে ভালো হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বাস আলাদা হলেও নারীদের হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ‘গোলাপি বাস’-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি গাজীপুর পরিবহনের বাসের চালক নারীচালকের উদ্দেশে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ ধরনের আচরণ গোলাপি বাসের চালক, সহকারী ও যাত্রীদের প্রায়ই শুনতে হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, রাস্তায় বাসের সংখ্যা কম থাকলে এমন প্রকল্প কার্যকর হওয়া কঠিন। একটি বাস যদি কোনো রুটে মাত্র একটি বা দুটি ট্রিপ দেয়, তাহলে কোনো নারী ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেটির জন্য অপেক্ষা করবেন না। প্রয়োজনের তাগিদে সামনে পাওয়া অন্য বাসেই তাঁকে উঠতে হবে। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট স্টপেজ ও সময়সূচি না থাকলেও এই সেবার প্রতি যাত্রীদের আগ্রহ কমে যাবে।
তিনি আরও বলেন, পরে যাত্রী না পাওয়ার অজুহাতে বিআরটিসি বাসগুলো বন্ধ করে দিতে পারে। তাই সেবাটি কার্যকর করতে পর্যাপ্ত বাস, নির্দিষ্ট স্টপেজ ও সময়সূচি নিশ্চিত করা জরুরি।
বাসের সংখ্যা কম হওয়ার বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, বাসের সংখ্যা কম বলেই রাস্তায় এগুলো কম দেখা যায়। যাত্রীরা এই বাস সম্পর্কে জানতে পারলে ধীরে ধীরে যাত্রী বাড়বে। বর্তমানে প্রতিটি বাস দিনে দুটি করে ট্রিপ দিচ্ছে। যাত্রীরা অভ্যস্ত হয়ে গেলে ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হবে। দুপুরে যাত্রী কম থাকায় ওই সময়ে বাস চালালে খালি বাস চলবে বলেও জানান তিনি।
নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া ‘গোলাপি বাস’ সেবা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করছে বাসের সংখ্যা, ট্রিপ, নির্দিষ্ট স্টপেজ ও সময়সূচি বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।

