স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা
রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া শক্তিশালী বোমাটির বিভিন্ন উপাদানের ফরেনসিক পরীক্ষা শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই সঙ্গে বোমাটির উৎস, তৈরির কৌশল এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ বা উগ্রপন্থি নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অতীতে উদ্ধার হওয়া অন্যান্য বোমার সঙ্গে এটির কোনো মিল রয়েছে কি না, তাও যাচাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ছাতার ভেতরে অভিনব কৌশলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বোমাটি। এটি জিআই পাইপ দিয়ে তৈরি করা হয় এবং এর সঙ্গে ব্যাটারি ও সার্কিট সংযুক্ত ছিল। বোমাটি এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল যে, কেউ ছাতাটি খোলার চেষ্টা করলেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারত।
শুক্রবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রা যখন মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে। জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক এড়াতে ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট’ হয়েছে বলে জানিয়ে শোভাযাত্রাকে নিরাপদে পাশ কাটিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, রথযাত্রাকে লক্ষ্য করেই নাশকতার উদ্দেশ্যে বোমাটি সেখানে রাখা হতে পারে।
ঘটনার পর শুক্রবার রাতে মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মির্জা মোহাম্মদ মুক্তা বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বেআইনিভাবে বিস্ফোরক দ্রব্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বহন ও ব্যবহারের পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
তদন্ত সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া এ ধরনের শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। সম্প্রতি কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও কুমিল্লায় উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক দ্রব্যের সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (সিটিটিসি) মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, বোমাটি অত্যন্ত কৌশলে ছাতার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, কেউ কৌতূহলবশত ছাতাটি খুলতে গেলেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারত, যা বড় ধরনের হতাহতের কারণ হতে পারত। এ ঘটনায় একাধিক সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত চালাচ্ছে।
সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা জানান, বোমাটিতে ব্যবহৃত উপকরণ শনাক্ত করতে আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। এর মাধ্যমে বিস্ফোরকটির উৎস ও প্রস্তুতকারীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে রথযাত্রার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সার্জেন্ট কাওসার হোসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কন্ট্রোল রুমে ফোন করে মেট্রোরেলের নিচে একটি আলোকিত ছাতা পড়ে থাকার বিষয়টি জানান। পরবর্তীতে মতিঝিল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ছাতার ভেতরে লাল আলো জ্বলতে থাকা বোমাসদৃশ বস্তু শনাক্ত করে।
রথযাত্রা শেষ হওয়ার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল বোমাটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে।
বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি একটি আইইডি (ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বা পাইপ বোমা ছিল। এর ভেতরে প্রায় দেড় কেজি বিস্ফোরক পদার্থের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ লোহার টুকরা ও বিয়ারিং বল পাওয়া গেছে। ব্যাটারি ও সার্কিটের মাধ্যমে এটি এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল যে, ছাতার বোতাম চাপলেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারত।
মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ চলছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

