Sunday, November 8

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত হামে ও এর উপসর্গে ৩১১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ৬১ জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

টিকাদান কর্মসূচিতে ভাঙন

বিশেষজ্ঞদের মতে, সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় দেশের দীর্ঘদিনের সফল টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়ে। একসময় নিয়মিত টিকাদানের কারণে হাম প্রায় বিরল হয়ে গেলেও চলতি বছর সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দ্রুত বেড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৪–২৫ সময়ে হাম ও রুবেলা (এমআর-১ ও এমআর-২) টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন সম্পূরক ক্যাম্পেইন না হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ।

কর্মসূচি বাতিল ও জটিলতা

স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার পর সেটির ধারাবাহিকতা বজায় না রেখে ২০২৫ সালের মার্চে পুরো কর্মসূচি বাতিল করা হয়। এর পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থায় যেতে গিয়ে ‘ব্রিজিং প্রকল্প’ নেওয়া হলেও অনুমোদন ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।

ফলে টিকা ও ওষুধ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। দেশের ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ওষুধ সংকট দেখা দেয়। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিও ব্যাহত হয়।

টিকা সংগ্রহে বিলম্ব

আগে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনা হলেও নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্র যুক্ত করায় প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। এতে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয় এবং একপর্যায়ে হামসহ ছয় ধরনের টিকার মজুত শেষ হয়ে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন পদ্ধতিতে অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় সময়মতো টিকা সংগ্রহ সম্ভব হয়নি।

কভারেজ কমে যাওয়ার প্রভাব

টিকাদানের কভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০২৩ সালে এমআর-১ টিকার কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশের বেশি, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে প্রায় ৯৩ শতাংশে। একইভাবে এমআর-২ টিকার কভারেজও কমে দাঁড়ায় প্রায় ৯১ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত কভারেজ আরও কম হতে পারে, কারণ মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবের চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে।

বিশেষ ক্যাম্পেইনের অভাব

পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানোর সুপারিশ থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২৬ সালে ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা অনেক দেরিতে হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়ার ফলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত সুরক্ষা নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।

তাদের মতে, সময়মতো পরিকল্পনা, দ্রুত টিকা সংগ্রহ এবং কার্যকর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে এই পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় যেতে গিয়ে প্রশাসনিক ও সমন্বয়জনিত জটিলতার কারণে বিলম্ব হয়েছে। তবে তারা দাবি করছে, টিকা সংগ্রহ ও কর্মসূচি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

Leave A Reply


Math Captcha
65 − 57 =