Tuesday, November 3

মেট্রোরেল প্রকল্পে সময়ক্ষেপণের মাশুল ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা

সময়মতো কাজ শুরু না করায় মেট্রোরেল প্রকল্পে এখন তাড়াহুড়োর সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়ও। ঢাকার মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ঋণচুক্তি ও ঠিকাদার নিয়োগের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় দ্রুত প্রকল্প দুটির সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণচুক্তি করা না গেলে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা অর্থায়ন থেকে সরে যেতে পারে। তখন নতুন করে ঋণ খুঁজতে হবে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাইকার সঙ্গে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ঋণচুক্তির সময়সীমা শেষ হবে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর। ঋণচুক্তির পাশাপাশি ১৩ অক্টোবরের মধ্যে ঠিকাদারের সঙ্গেও চুক্তি করতে হবে। এ কারণে সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটির সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একনেকের অনুমোদন না হলে পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে হতে পারে। নতুন করে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু থেকে করতে হবে। এতে প্রকল্পের সময় আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণকাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত এই প্রকল্প ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্পের মেয়াদ আরও সাত বছর বাড়িয়ে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত করার কথা বলা হচ্ছে।

একই সঙ্গে লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বাড়ছে। মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ৬২ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে সংশোধিত প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ১১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ বাড়ছে।

একই সময়ে শুরু হওয়া এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। নতুন প্রস্তাবে এর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩২ সাল পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে। এ প্রকল্পে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ৪৯ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা খরচ হবে, যা মূল ব্যয়ের ১২১ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি।

দুই প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত হলে মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই প্রকল্পে মোট ব্যয় বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণচুক্তি না হলে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে জাইকা সরে যেতে পারে। তখন নতুন করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে ঋণের উৎস খুঁজতে হবে।

ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, চলমান কাজ বন্ধ না হলে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হতো না। ব্যয় কমানোর কথা বলে প্রকল্পের কাজ দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় এখন ব্যয় আরও বেড়েছে। তার মতে, ব্যয় কমানোর উদ্যোগের মাশুল হিসেবেই এখন প্রকল্প দুটির ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা বাড়ছে।

মেট্রোরেলের বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জাপানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে জাইকার কর্মকর্তাদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজিমা করপোরেশন কাজ ছেড়ে চলে গেছে। আরও কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও সরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পের ব্যয় কমাতে একটি কমিটি গঠন করেছিল। তারা পুনরায় দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন চেয়ে জাইকার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও জাইকা তাতে সম্মতি দেয়নি। সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি করার প্রক্রিয়াও সে সময় এগোয়নি।

ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তনও বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমআরটি লাইন-১-এর গুলশান-২ ও নতুন বাজার স্টেশনের গভীরতা বাড়ানোর কারণে খনন, ডায়াফ্রাম ওয়াল এবং ভূগর্ভস্থ পূর্তকাজের পরিমাণ ও ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২০ কিলোমিটার ডিটুর সড়ক এবং অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৯১ কিলোমিটার ট্র্যাক নির্মাণের বিষয়ও সংশোধিত প্রস্তাবে যুক্ত হয়েছে।

পাতাল রেল নির্মাণের ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণ ও অতিরিক্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্যও অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ডিপো এলাকার আয়তন বাড়ায় ভূমি উন্নয়ন, ভরাট, ড্রেনেজ, ইউটিলিটি, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ডিপো অবকাঠামোর ব্যয়ও বাড়ছে।

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারও ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ। মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ডলারপ্রতি ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা হিসাব করা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে তা ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে কভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের মূল্যস্ফীতিকেও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ঢাকার জন্য মেট্রোরেল এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা ঠিক হয়নি। সময়মতো কাজ এগোলে ব্যয় এতটা বাড়ার সুযোগ থাকত না।

সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মোকছেদ আলী বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় একনেক সভায় প্রকল্প দুটি ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রকল্প দুটির অনুমোদন পাওয়া যাবে।

এমআরটি লাইন-১-এর মোট দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার অংশ পুরোপুরি পাতাল হবে এবং এতে থাকবে ১২টি স্টেশন। নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার অংশের বেশিরভাগ উড়ালপথ। এই অংশে নতুন বাজার ও নদ্দায় পাতাল স্টেশন থাকবে।

অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) হেমায়েতপুর থেকে বালিয়ারপুর, আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর, বনানী, গুলশান-২ ও নতুন বাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়ালপথ। এ লাইনে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে, যার ৯টি পাতাল ও ৫টি উড়াল।

দুই মেট্রোরেল লাইনের মধ্যে নতুন বাজার হবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। সেখানে দুই লাইনের যাত্রীরা আন্তঃসংযোগের সুবিধা পাবেন। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে সময় ও ব্যয় বাড়ায় ঢাকার যানজট কমানোর এই বহুল প্রত্যাশিত পরিকল্পনার সুফল পেতে নগরবাসীকে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 52 = 58