Friday, November 6

অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সিলেট সার্কিট হাউস মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়নসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অপরাধী সে অপরাধীই। তার রাজনৈতিক অ্যাফিলিয়েশন বা পরিচয় দেখে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সভায় সিলেট অঞ্চলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের নিরপেক্ষভাবে তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের পরিচয় সবারই জানা থাকে। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো নিরীহ মানুষকে হয়রানি করতে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকৃত কোনো অপরাধীকেও বাদ দেওয়া যাবে না।

আগামী এক মাসের মধ্যে এ নির্দেশনার দৃশ্যমান ফল দেখতে চান বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পুলিশ বাহিনীতে ‘পুরস্কার ও শাস্তি নীতি’ চালু করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে সফলতা ও ব্যর্থতার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হবে। সিলেট রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মহানগর পুলিশকে (এসএমপি) এসব নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের কথাও বলেন তিনি।

ঢালাও আসামি করার মামলা পর্যালোচনার নির্দেশ

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী বিভিন্ন মামলা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এজাহারে ঢালাওভাবে ৫০০, ১ হাজার বা ২ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বাদী না হলেও তৃতীয় পক্ষ নিজেদের স্বার্থে মামলা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি বা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যেও মামলা করার ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এর ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তার পরিবার বাদী হতে না পারলেও রাজনৈতিক পরিচয়ের একজন ব্যক্তি বাদী হয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে আসামি করেছেন। অথচ ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব ছিল।

এ প্রেক্ষাপটে সিলেট রেঞ্জ ও সিলেট মহানগর এলাকায় এ ধরনের মামলাগুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নিরীহ ও অযথা হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন তিনি।

তবে এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের তদবির, দেনদরবার বা অনৈতিক লেনদেন যাতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী ও অপরাধের নির্দেশদাতারা যেন কোনোভাবেই বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন তিনি।

বালি-পাথর কোয়ারি নিয়ে জাতীয় কমিটি

সিলেটের বালি ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকার কারণে তৈরি হওয়া পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়েও সভায় কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, পরিবেশ রক্ষা ও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তার নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি কাজ করছে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে এ বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ-সংক্রান্ত মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে তদারকি জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।

‘মব’ সহ্য করা হবে না

দাবিদাওয়া আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ, ঘেরাও কিংবা ‘মব’ বা জনতার চাপ সৃষ্টি করে অরাজকতা করার প্রবণতার বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সরকার কোনোভাবেই মব সংস্কৃতি বা অরাজকতা সৃষ্টির অপসংস্কৃতি সহ্য করবে না। কোনো দাবি থাকলে প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্মারকলিপি দেওয়া, সংবাদ সম্মেলন করা কিংবা অন্যান্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে তা তুলে ধরতে হবে।

২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মবের ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি। সিলেট অঞ্চলকে সম্পূর্ণ মবমুক্ত রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শীর্ষ ৫০ মাদক কারবারির তালিকা করার আহ্বান

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু সাধারণ মাদকসেবীদের পেছনে না ছুটে শীর্ষ মাদক কারবারিদের শনাক্ত করতে হবে। অন্তত ৫০ জন শীর্ষ মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের লজিস্টিক সংকট দূর করা, নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত পুলিশি যানবাহন সরবরাহের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। দেশের ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে এসএমপির কার্যক্রম পরিচালনাধীন এলাকা বড় হওয়ায় প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও বাড়াতে প্রতিটি ইউনিটকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

মতবিনিময় সভায় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বক্তব্য দেন।

এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন ও পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধ দমনে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি অপরাধীদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

Leave A Reply


Math Captcha
− 1 = 1