Friday, November 6

একজন মানুষকে হারানোর কষ্ট হয়তো একসময় চোখের পানিতে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু একজন মানুষ কোথায়—বেঁচে আছেন, নাকি নেই—তা না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার কষ্টের কোনো ভাষা নেই। এই অপেক্ষা যেমন গভীর বেদনার, তেমনি এক অনিশ্চিত জীবনের নাম।

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি শুধু গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করার দিন নয়; একই সঙ্গে সেইসব মা, স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের কথা স্মরণ করার দিন, যাদের প্রিয়জন একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেছেন। প্রিয় মানুষটি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে অসংখ্য পরিবার বছরের পর বছর পার করেছে।

বাংলাদেশও এই নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের কাছে জমা পড়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের ভাষ্য, গুমের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০১৭ সালে ১৯৪টি, ২০১৮ সালে ১৯২টি, ২০১৯ সালে ১১৮টি, ২০২২ সালে ১১০টি এবং ২০২৩ সালে ৬৫টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের লক্ষ্য করে গুমের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের সংখ্যা ৬৮ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংখ্যার আড়ালে অসংখ্য পরিবার

এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং অসংখ্য অসমাপ্ত গল্প। কোনো শিশুর কাছে বাবার একটি ছবি হয়তো এখনো সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি। কোনো মা হয়তো আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—এই বুঝি তার সন্তান ফিরে এলো। কোনো স্ত্রী হয়তো এখনো বিশ্বাস করেন, একদিন হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়বেন তার স্বামী।

কিন্তু বছর যায়, বছর আসে; মানুষটি আর ফিরে আসেন না। অপেক্ষা শুধু দীর্ঘ হতে থাকে।

গুম একটি মানুষকে শুধু তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও যেন থমকে যায়। স্বজনেরা একদিকে প্রিয়জনকে খুঁজে ফেরেন, অন্যদিকে প্রতিদিন নতুন করে ভয়, হতাশা ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেন।

ইলিয়াস আলীসহ নিখোঁজদের অপেক্ষা

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও এ প্রসঙ্গে বারবার আলোচনায় আসে। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তার সন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছে। তাকে ফিরে পাওয়ার আশার কথাও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।

একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে নির্মম পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? প্রিয় মানুষটি মারা গেছেন—এ কথা নিশ্চিতভাবে জানতে পারলেও একসময় পরিবার বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শোক করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু মানুষটি কোথায়, কী অবস্থায় আছেন—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পরিবারকে প্রতিদিন নতুন করে যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে।

তারা শোকও করতে পারে না, আবার আশাও পুরোপুরি ছাড়তে পারে না। এ এক গভীর মানসিক যন্ত্রণা।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে থাকার বার্তা

গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ভুক্তভোগী স্বজনদের অভিজ্ঞতা শোনেন। ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারির ওই অনুষ্ঠানে স্বজনদের বক্তব্য শুনে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট, বেদনা এবং প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি তুলে ধরেন।

সেখানে সন্তান হারানো মা, বাবাকে না-পাওয়া শিশু এবং স্বামী হারানোর অপেক্ষায় থাকা নারীদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা উঠে আসে। এসব গল্প মনে করিয়ে দেয়, গুমের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকেই বিপর্যস্ত করে না—এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।

তারেক রহমান ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের দাবি পূরণের কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতের গুম-খুনের ঘটনায় দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়বিচার

গুমের শিকার পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় দাবি—তারা সত্য জানতে চান এবং বিচার চান। তাদের প্রশ্ন, প্রিয়জনদের কী হয়েছিল, কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং নিখোঁজ হওয়ার জন্য কারা দায়ী?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তবে বিচার হতে হবে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হতে হবে রাষ্ট্রের পথ।

কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো অপরাধের বিচার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভিত্তিতে হতে পারে না।

গুম প্রতিরোধে আইনি উদ্যোগ

ভবিষ্যতে যেন আর কোনো নাগরিক গুমের শিকার না হন, সে জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুমের ফলে মৃত্যু হলে বা দীর্ঘ সময় পরও ব্যক্তিকে উদ্ধার করা না গেলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।

তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না। আইন বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো নাগরিককে তার রাজনৈতিক মত, বিশ্বাস, পরিচয় কিংবা অন্য কোনো কারণে বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আর কোনো পরিবারকে অপেক্ষায় রাখতে নয়

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একটি পরিবার বছরের পর বছর একজন মানুষের অপেক্ষায় থাকবে?

উত্তর অবশ্যই না।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো রাজনৈতিক মত, বিশ্বাস বা পরিচয়ের কারণে কাউকে অন্যায়ভাবে তুলে নেওয়া হবে না। কোনো পরিবারকে অন্ধকারে রেখে দেওয়া হবে না। কোনো মা তার সন্তানের ভাগ্য জানার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না। কোনো শিশু বাবার ফিরে আসার আশায় শৈশব পার করবে না।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সহানুভূতি প্রকাশে শেষ হতে পারে না। তাদের সত্য জানাতে হবে, ন্যায়বিচারের পথ খুলে দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মানবিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

যে মা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার চোখের পানি যেন আর বৃথা না যায়। যে সন্তান আজও বাবার একটি স্পর্শের অপেক্ষায় আছে, তার অপেক্ষার যেন একটি উত্তর আসে। যে স্ত্রী বছরের পর বছর স্বামীর ফেরার আশায় দিন গুনছেন, তার বুকের দীর্ঘশ্বাস যেন একদিন থামে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে অঙ্গীকার হোক—বাংলাদেশ আর কখনো গুমের অন্ধকারে ফিরে যাবে না। মানুষের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে; প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার।

কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, প্রশাসন কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থায় নয়—তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সেই রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার কতটা মূল্য দেয়।

Leave A Reply


Math Captcha
30 − = 21