Friday, November 6

শিল্প খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট কাটিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতত এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে

বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ রোববার যুগান্তরকে বলেন, লোডশেডিং কমাতে সরকার বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে শিল্প খাতকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বিশ্ববাজার পরিস্থিতিতে এলএনজির তুলনায় ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কিছুটা কম। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি স্পট মার্কেটে টেন্ডার করেও পর্যাপ্ত এলএনজি সরবরাহকারী পাওয়া যাচ্ছে না। ২৬ আগস্টের নির্ধারিত একটি এলএনজি কার্গোর জন্য টেন্ডার করা হলেও সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি।

এ পরিস্থিতিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছে দেশের শত শত শিল্পকারখানা। গত ১২ আগস্ট শিল্প খাত থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে সরিয়ে দেওয়ার পর বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও শিল্পে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যায় বা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।

শিল্প খাতের এই সংকট কাটাতে শনিবার রাত থেকে গ্যাসের বরাদ্দে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে এত দিন দৈনিক প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও এখন তা কমিয়ে ৮৫ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে। বিপরীতে শিল্প, বাসাবাড়ি, সিএনজি ও অন্যান্য খাতে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১৩৫ কোটি ঘনফুট। সার খাতে দেওয়া হচ্ছে ১৭ কোটি ঘনফুট।

রোববার বিকেল ৪টার হিসাবে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৩৭ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ হয়েছে ৭৫ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ২৬ আগস্টের জন্য নতুন এলএনজি কার্গো পাওয়া যায়নি। ফলে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ২৩৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।

এ অবস্থায় গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রোববার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে শিল্প খাতকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়।

দেশে ৫৩টির বেশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও রোববার দুপুর ২টার হিসাবে উৎপাদন হচ্ছিল প্রায় ২ হাজার ১৪৭ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিট হাসনাত বলেন, তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সহজেই ৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তবে এজন্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা প্রয়োজন। পাওনা পরিশোধ হলে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থে জ্বালানি সংগ্রহ করে উৎপাদন বাড়াতে পারবে।

বিপ্পার তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে এলএনজির দাম অনেক বেশি। বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট এলএনজি প্রায় ২৪ ডলারে কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতি টন প্রায় ৭৫০ ডলার। হিসাব অনুযায়ী, এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজি ও ফার্নেস অয়েলের জ্বালানি খরচের পার্থক্য খুব বেশি নয়। তবে আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের প্রকৃত খরচ বাড়তে পারে।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন গরম অব্যাহত থাকার পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদাও বেশি থাকতে পারে। তাই গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) পর্যাপ্ত ফার্নেস অয়েল মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। চাহিদা মেটাতে তেল বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গ্যাস সংকটের পেছনে এলএনজি সরবরাহের সাম্প্রতিক সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখছে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের বয়লারে আগুন লাগার পর দেশের গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। ৫ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও সেখানে নিয়মিত এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সামিটের টার্মিনালেও নিয়মিত কার্গো আসেনি। পরে ২২ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি কার্গো যুক্ত হওয়ার পর গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ে।

এদিকে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে সরকার। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে সবার আগে রাজধানী ঢাকায় লোডশেডিং করা হবে। তবে সেখানে তা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা থাকবে। এরপর জেলা শহর এবং সর্বশেষ পর্যায়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং করা হবে।

সরকারের লক্ষ্য, একদিকে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং অন্যদিকে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ করা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধের সক্ষমতার ওপর এ উদ্যোগের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে।

Leave A Reply


Math Captcha
70 + = 73