স্টাফ রিপোর্টার |
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সরকারি বাসভবন গণভবন এখন রূপ নিয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে’। আগামী ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনকে সামনে রেখে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তবে জাদুঘরটির স্থায়ী জনবল নিয়োগ এখনো সম্পন্ন হয়নি।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানিয়েছেন, জনবল নিয়োগ সম্পন্ন না হলেও নির্ধারিত সময়েই জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হবে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, টিকিটিং ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি বর্তমানে চলমান রয়েছে।
গণভবন থেকে স্মৃতি জাদুঘর
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর গণভবনে প্রবেশ করে সাধারণ মানুষ। পরবর্তীতে ভবনটিতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগের সুইচবোর্ড থেকে শুরু করে ‘গণভবন’ লেখা নামফলক পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত প্রায় ১৭ দশমিক ৬৮ একর আয়তনের গণভবনের ব্যবস্থাপনা প্রথমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে ন্যস্ত করা হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ভবনটিকে একটি স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে জাদুঘরটির আইনি ভিত্তিও নিশ্চিত করা হয়।
নির্মাণে ব্যয় ১১০ কোটি টাকার বেশি
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ ও সংস্কার কাজে মোট ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জাদুঘরের পরিচালন ব্যয়ের জন্য ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর মূল ভবনের সংস্কার, বৈদ্যুতিক ও অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে জাতীয় জাদুঘর ভাস্কর্য নির্মাণ, শিল্পকর্ম সংগ্রহ, গ্যালারি সাজানো, তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং অভ্যন্তরীণ নান্দনিক উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করেছে।
কী থাকছে জাদুঘরে?
জাদুঘরটিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, গুম-খুন ও নির্যাতনের স্মারক সংরক্ষণের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন নিদর্শন স্থান পেয়েছে।
জাদুঘরে যা থাকছে—
- জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী।
- গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মারক ও তথ্যভাণ্ডার।
- গণভবন থেকে উদ্ধার হওয়া নথিপত্র।
- পাঁচটি নতুন ওয়াকওয়ে এবং সম্প্রসারিত লেক এলাকা।
- ফুডকোর্ট, প্রার্থনাকক্ষ, প্রক্ষালনকক্ষ ও টিকিট হাউস।
- স্যুভেনির শপ এবং প্রতীকী ‘আয়নাঘর’।
- হেলিপ্যাড এলাকায় নির্মিত ‘জুলাই মঞ্চ’।
- ১৯টি ভিন্ন থিমে নির্মিত ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র।
- জুলাই আন্দোলন, শাপলা ট্র্যাজেডি ও বিডিআর বিদ্রোহসহ বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিস্তম্ভ।
- প্রায় ৪ হাজার ভুক্তভোগীর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ এবং আড়াই হাজারের বেশি প্রতীকী কবর।
- শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিওচিত্র ও ঐতিহাসিক তথ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা।
জাদুঘরটিতে আধুনিক প্রদর্শনী প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি চীনের উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় ডিজিটাল উপস্থাপনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জনবল সংকট ও নিয়োগ বিতর্ক
জাদুঘরটির নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আপাতত জাতীয় জাদুঘরের ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ৬২টি পদে শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
জাদুঘর নির্মাণের বিভিন্ন কাজ সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং আপ্যায়ন বিল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারের অনুমোদন এবং প্রচলিত বিধি অনুসরণ করেই দ্রুততম সময়ে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব স্বীকার করেছেন যে, দ্রুত কাজ করতে গিয়ে কিছু প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দ্রুত উদ্বোধনের পক্ষে মত
জাদুঘর পর্ষদের সদস্য এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলের অত্যাচার-নির্যাতনের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে দ্রুত জাদুঘরটি চালু করা প্রয়োজন।
তার ভাষায়, “জাদুঘরে গিয়ে সবাই যেন জানতে পারে—এই মানুষগুলো দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।”
আগামী ৫ আগস্ট উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক হিসেবে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।

