Friday, November 6

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি |

সবুজ পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সুপরিচিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য একটি পাহাড়ের অংশ সমতল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরের পাশের পাহাড়ে ইতোমধ্যে প্রায় দুই শতাংশ জায়গা কেটে সমতল করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সেখানে একটি খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর), নির্মাণসামগ্রী এবং কাটা অবস্থায় কয়েকটি গাছ পড়ে রয়েছে। খালি চোখেই প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার পাহাড়ের একটি অংশ সমান করে ফেলার চিত্র দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ এপ্রিল পরিবহন দপ্তরের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রথম ধাপে প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট এলাকায় ভবনের একটি অংশ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে এ ধাপের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে প্রায় ২২ হাজার বর্গফুট এলাকায় তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত) অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পাহাড় বা টিলা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জাতীয় স্বার্থে বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

চট্টগ্রাম বিভাগের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন জানিয়েছেন, দেশের যেকোনো স্থানে পাহাড় কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি বাধ্যতামূলক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছিল। তবে সেখানে ভবনের আয়তন পাঁচ হাজার বর্গমিটারের কম উল্লেখ করা হয়েছিল এবং পাহাড় কাটার কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ বলেন, কতটি গাছ কাটা হয়েছে বা কী পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তার দাবি, মূলত পাহাড়ের ঢালের ভেঙে পড়া অংশেই কাজ করা হয়েছে।

পাহাড় কাটার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘আওয়ার গ্রিন ক্যাম্পাস’-এর সভাপতি মো. মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ভবন নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশের ক্ষতি না করে বিকল্প স্থানে ভবন নির্মাণ করা যেত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সমাজসেবা ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক তাহসিনা রহমান অভিযোগ করেন, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভবন নির্মাণ প্রকল্প সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের আগে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। এ বিষয়ে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

তবে পাহাড় কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো পাহাড় কাটছে না, কেবল সামান্য একটি অংশ সমান করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। তার ভাষ্য, “আমরা খুব বেশি ক্ষতি করছি না। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রক্রিয়ায় গেলে অনেক ঝামেলা হয়, তাই বিষয়টি আমরা নিজেরাই সতর্কতার সঙ্গে দেখছি।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের সুপারনিউমারি অধ্যাপক কামাল হোসাইন এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, পাহাড়ের সামান্য ক্ষতিও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চট্টগ্রামের পাহাড়ি মাটি তুলনামূলকভাবে অস্থিতিশীল হওয়ায় যেকোনো ধরনের কাটাছেঁড়া ভূমিধসসহ পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম অবশ্যই প্রয়োজন। তবে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যাতে পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করাই হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড় কাটার এই অভিযোগ নতুন করে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পরিবেশগত আইন মেনে টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 7 = 17