সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দেন।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর ৫৪ অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ গ্রহণ কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
স্পিকার বলেন, “রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেছেন। তাঁর লিখিত পদত্যাগপত্র গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আমি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শুরু করেছি।”
তিনি আরও জানান, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন মো. সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতির অফিসিয়াল প্যাডে স্পিকারকে লেখা পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সংবিধানের প্রতি আনুগত্য রেখে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিঠিতে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় তিনি সংবিধানের আলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে ভূমিকা পালন করেন।
তিনি দাবি করেন, তাঁর ইতিবাচক ও দৃঢ় ভূমিকার কারণেই দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি এবং বর্তমানে সরকার ও বিরোধী দল সংসদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পালন করছে।
অসুস্থতার কারণেই পদত্যাগ
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। এছাড়া তাঁর হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি শনাক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন এবং রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান।
তিনি লেখেন, “আমার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন। এমতাবস্থায় সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।”
৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাধ্যতামূলক।
নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ইতোমধ্যে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ)।
বঙ্গভবন ছাড়ছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর মো. সাহাবুদ্দিন আগামী রোববার সপরিবারে বঙ্গভবন ত্যাগ করবেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তিনি রাজধানীর গুলশানের নিজস্ব বাসভবন ‘গ্রিন ভিলা’-তে বসবাস করবেন।
এ লক্ষ্যে বাসভবনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে। নতুন টেলিফোন সংযোগ স্থাপনসহ নিরাপত্তা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর স্পিকার তাঁর স্বাভাবিক দায়িত্বে ফিরে আসবেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে গত কয়েকদিনের রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। এখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে নজর রাজনৈতিক অঙ্গনের।

