Saturday, November 7

মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দুই দফা পাহাড়ি ঢল ও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়েছে। হাওর অঞ্চলের বন্যার ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে। তাদের আশঙ্কা, দেশে চালের মোট ঘাটতি ছয় থেকে সাত লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য সমন্বিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকার কৃষি ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে, যা মোট কৃষিজমির ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার কৃষক এবং ধানের উৎপাদন কমেছে প্রায় দুই লাখ ১৩ হাজার টন।

এরই মধ্যে জুলাই মাসে চট্টগ্রাম বিভাগসহ দেশের ৪৩ জেলায় নতুন করে বন্যা দেখা দেয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে এক লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৪ জন প্রান্তিক কৃষক।

চট্টগ্রামে চলতি মৌসুমে আউশ ও আমনের চাষাবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে করার পরিকল্পনা ছিল। তবে টানা ১০ থেকে ১২ দিন পাঁচ থেকে সাত ফুট পানির নিচে তলিয়ে থাকায় বোনা ও রোপা আউশের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর আমনের বীজতলা ধ্বংস হওয়ায় আগামী মৌসুমে চারার সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলের পেয়ারা, লেবু ও আনারসের বাগানের শিকড় পর্যন্ত পচে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ফল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বন্যার বড় ধাক্কা লেগেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও। চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার প্রায় ৩৫ হাজার ৫০০টি পুকুর ও চিংড়ি ঘের পানিতে ভেসে গেছে। রুই মাছের লাখ লাখ পোনা নষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে চারণভূমি প্লাবিত হওয়ায় গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

ডেইরি ও পোলট্রি খামারে বহু গবাদিপশু ও কয়েক লাখ মুরগি মারা গেছে। দুধ উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সরকারি হিসাবে প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৪৫০ কোটি টাকার বেশি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যার পর গবাদিপশুর মধ্যে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এজন্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে গোখাদ্যের অভাব।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে মানুষের পাশাপাশি পশুখাদ্যের জন্যও পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম শুধু ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জরুরি ভিত্তিতে কৃষকদের জন্য বীজ ও চারা সরবরাহ, খামারিদের জন্য গোখাদ্য, ওষুধ ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

কৃষি ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আমন মৌসুমের শেষ সময়ে নতুন করে বীজতলা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। অন্য জেলা থেকে চারা সরবরাহ করা না গেলে অনেক জমি অনাবাদি থেকে যেতে পারে। এছাড়া অনেক কৃষক ও খামারি ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। ফসল ও সম্পদ হারিয়ে তারা এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খান জানিয়েছেন, বন্যায় আউশের প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষতি হলে উৎপাদন অন্তত সাড়ে চার লাখ টন কমে যেতে পারে। হাওর অঞ্চলের আগের ক্ষতির সঙ্গে এই ক্ষতি যোগ হলে দেশে মোট চালের ঘাটতি ছয় থেকে সাত লাখ টনে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের চালের চাহিদা পূরণে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শীতকালীন সবজির আবাদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সম্প্রতি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে কৃষি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হলেও কৃষকদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সরকার বীজ, সার, গবাদিপশুর ভ্যাকসিনসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছে।

Leave A Reply


Math Captcha
48 − = 39