রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই বিভীষিকাময় দিনে। বিচার, যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের দাবিতে এখনও অপেক্ষা করছেন তারা।
গত বছরের ২১ জুলাই সংঘটিত ওই দুর্ঘটনায় ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক, একজন আয়া এবং যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া আহত হন অন্তত ৮০ জন, যাদের মধ্যে ৫৭ জনকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছিল।
নিহতদের একজন ছিল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বোরহান উদ্দিন বাপ্পি। ছেলেকে হারানোর বেদনা স্মরণ করে মা বীথি আক্তার বলেন, সকালে সুস্থ সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন তিনি। দুপুরে টিফিনও পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন হাসপাতাল থেকে ছেলের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে।
তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর বোরহানের মরদেহ এতটাই দগ্ধ হয়েছিল যে মুখমণ্ডলও চেনা যাচ্ছিল না। ছেলের স্মৃতি বহন করতে না পেরে ছোট ছেলেকে মাইলস্টোন থেকে অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন পরিবারটি।
একই ঘটনায় প্রাণ হারায় আপন ভাই-বোন তাহিয়া আশরাফ নাজিয়া ও আরিয়ান আশরাফ নাফি। তাদের বাবা আশরাফুল ইসলাম জানান, নাজিয়ার শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং নাফির প্রায় পুরো শরীর দগ্ধ হয়েছিল।
অন্যদিকে, দুর্ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্ত। তার শরীরে ৩৬ বার অস্ত্রোপচার এবং আটবার স্কিন গ্রাফটিং করা হয়েছে। প্রায় ৯৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও এখনও নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুপি বড়ুয়া রয়া তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। দগ্ধ হওয়ার কারণে তার হাতের আঙুলগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। বর্তমানে সে বাসায় শিক্ষকের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তার পরিবারের অভিযোগ, শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক আঘাতও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে শিশুটির জীবনে।
রুপির বড় বোন একা বড়ুয়া বলেন, “এই দুর্ঘটনা আমাদের পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। বোনের দেখাশোনার কারণে আমি নিজের পড়াশোনা ও চাকরির পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছি।”
পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী কাফি আহমেদ তাইফ ৭০ দিন বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিল। এখনও সে হাত সম্পূর্ণভাবে মুঠ করতে পারে না এবং মুখমণ্ডলের দগ্ধ হওয়ার কারণে মানসিকভাবে ভুগছে। তার বাবা মেরাজ আহমেদ প্রশ্ন তুলেছেন, “এই দুর্ঘটনার দায় কার? আহত শিশুদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কে নেবে?”
দুর্ঘটনার পর সরকার নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ছিল পাইলটের উড্ডয়নজনিত ত্রুটি। এছাড়া মাইলস্টোন স্কুল ভবনের নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কমিশন জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের সুপারিশ করে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ এলাকার মধ্যে থাকা জনসমাগমপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশও উঠে আসে।
এ ঘটনায় দায় নিরূপণ, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে বর্তমানে হাইকোর্টে একাধিক রিট আবেদন বিচারাধীন রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে এককালীন আর্থিক অনুদানের সিদ্ধান্ত জানালেও অধিকাংশ পরিবার এ অর্থকে বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে দাবি করেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, সন্তানের জীবনের বিনিময়ে কোনো আর্থিক অনুদানই যথেষ্ট নয়।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরন্ নবী জানিয়েছেন, আহত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যারা স্কুলে আসতে পারছে না, তাদের বাসায় শিক্ষক পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
নিহত শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তারের মামা সাংবাদিক লিওন মীর বলেন, “আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ চাই না। সন্তানের মৃত্যুর মূল্য অর্থ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। আমরা চাই সুষ্ঠু বিচার এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক।”
দুর্ঘটনার এক বছর পরও নিহতদের পরিবারগুলোর প্রশ্ন একই—এই মর্মান্তিক ঘটনার দায় কার, এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে রাষ্ট্র কী ব্যবস্থা নেবে? বিচার, পুনর্বাসন এবং নিরাপদ শিক্ষাঙ্গনের প্রত্যাশায় এখনও অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

