Saturday, October 24

বিদেশে কাজ করে ঋণ শোধ ও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার তিন যুবক। কিন্তু নির্মাণকাজের বদলে তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। স্বজনদের কাছে আসা খবর অনুযায়ী, ড্রোন হামলায় প্রাণ গেছে তিনজনেরই। তাঁরা হলেন বীর নলহরা গ্রামের নজরুল ইসলাম, মজিদপুরের পবিত্র চন্দ্র সূত্রধর ও দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম।

তিন যুবকের মৃত্যুতে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে ঋণের বোঝা, পাওনাদারদের চাপ ও জমি হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা স্বজনেরা।

পরিবারগুলোর অভিযোগ, গত ৭ মে নির্মাণকাজের ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ৩০ বাংলাদেশিকে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে নিয়ে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধে নামানো হয়। ওই ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

নজরুলের পরিবার জানায়, রাশিয়ায় যেতে তাঁর বড় ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বন্ধক রেখে ৯ লাখ টাকা জোগাড় করেন। গত ২৯ জুলাই সর্বশেষ ফোনে নজরুল বলেছিলেন, তাঁদের যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। মাকে ও সন্তানদের দেখে রাখার অনুরোধও জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর চার সন্তান রয়েছে। বন্ধক রাখা জমির টাকা পরিশোধ করতে না পারলে জমি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে পরিবারটি।

পবিত্র চন্দ্র সূত্রধর রাশিয়ায় যাওয়ার খরচ জোগাতে স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেন। পরিবারের দাবি, সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। গত ২৯ মে তাঁর সঙ্গে স্ত্রীর সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। পরে সহযাত্রীদের কাছ থেকে মৃত্যুর খবর পান স্বজনেরা। ঋণদাতাদের চাপে পরিবারটি এখন অবশিষ্ট জমি বিক্রির কথা ভাবছে। পবিত্রর বৃদ্ধ বাবা ছেলেকে জীবিত ফেরত অথবা তাঁর মরদেহ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ব্যবসায় ক্ষতির কারণে আমিনুল ইসলামের আগে থেকেই ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ঋণ ছিল। রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য জমি বন্ধক ও ধারদেনা করে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকা জোগাড় করেন তিনি। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে রেখে বিদেশে যান আমিনুল।

তাঁর বড় ভাই কামরুল হাসান জানান, গত ২৯ মে ভোরে সর্বশেষ ফোনে আমিনুল যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বলেছিলেন। মাইন ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির কথা জানিয়ে তাঁদের উদ্ধারে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করার আকুতি জানিয়েছিলেন তিনি।

কামরুলের ভাষ্য, এক সহযাত্রীর কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছেন, ১৬ জনের একটি দলের ১২ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে গোপালপুরের তিন যুবকও রয়েছেন। আহত কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।

স্বজনদের অভিযোগ ও পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাজের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারানো এই যুবকদের পরিবার এখন প্রিয়জন হারানোর শোকের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ ও জীবিকা নির্বাহের অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

Leave A Reply


Math Captcha
41 + = 42