Friday, November 6

শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশে দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অবস্থান করছেন ভারতে। এমন পরিস্থিতিতে তার অনুপস্থিতিতে দলটির নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন শেখ হাসিনা নিজেই। সেখানে তিনি সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম উল্লেখ করেছেন।

এতে সামনে এসেছে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে সভাপতির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের বিধান কী রয়েছে, সেই প্রশ্নও।

দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সভাপতি দলের প্রধান। তিনি দলের কাউন্সিল, জাতীয় কমিটির অধিবেশন, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও সভাপতিমণ্ডলীর সভায় সভাপতিত্ব করবেন। একই সঙ্গে গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা ব্যাখ্যা করার অধিকারও সভাপতির ওপর ন্যস্ত।

কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের মনোনয়নের ক্ষেত্রেও সভাপতির ক্ষমতা রয়েছে। আর সভাপতির অনুপস্থিতিতে কে তার দায়িত্ব পালন করবেন, সেটিও নির্ধারণ করার এখতিয়ার সভাপতির রয়েছে।

গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘সভাপতি তাহার অনুপস্থিতিকালের জন্য সভাপতিমণ্ডলীর যে কোনো সদস্যকে সভাপতির কার্য সম্পাদনের জন্য দায়িত্ব প্রদান করবেন।’

অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কে হবেন, সে বিষয়ে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, যাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে তাকে অবশ্যই সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হতে হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর তালিকায় একসময় ছিলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফর উল্লাহ, সাহারা খাতুন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, রমেশ চন্দ্র সেন, আব্দুল মান্নান খান ও আব্দুল মতিন খসরু।

তাদের মধ্যে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, সাহারা খাতুন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, রমেশ চন্দ্র সেন, আব্দুল মান্নান খান, পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য ও আব্দুল মতিন খসরু মারা গেছেন। ফলে তাদের কেউ বর্তমানে সভাপতির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য বিবেচিত হতে পারেন না।

জীবিত সদস্যদের মধ্যে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নামই সামনে রয়েছে। তিনি শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্যদের একজন।

দ্য ওয়ালকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তার বোন শেখ রেহানার রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা নেই। ফলে তার অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে শেখ সেলিম দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এ ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র অনুসরণের কথাই বলেছেন শেখ হাসিনা। আর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সভাপতিমণ্ডলীর যেকোনো সদস্যকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে।

তবে সভাপতিমণ্ডলীর জীবিত সদস্যদের কেউ বর্তমানে দেশে নেই। শেখ সেলিমও বিদেশে অবস্থান করছেন।

শেখ সেলিমকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মধ্যে আগে থেকেই অসন্তোষ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

শেখ সেলিমের পরিবারের সঙ্গে বর্তমান বিএনপি সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তার বেয়াই। শেখ সেলিমের ছোট ছেলে শেখ ফজলে নাইম বিয়ে করেছেন ইকবাল হাসান মাহমুদের মেয়েকে। আর তার বড় ছেলে শেখ ফজলে ফাহিমের স্ত্রী বর্তমান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বোন।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ বর্তমানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে।

দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা বিদেশে অবস্থান করছেন। দেশে থাকা অনেক নেতা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দলটির নেতৃত্ব ও পুনর্গঠন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই শেখ সেলিমকে সম্ভাব্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার বক্তব্যে উল্লেখ করার বিষয়টি আওয়ামী লীগের ভেতরে নতুন আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

দলের এক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাজনীতি করে আর লাভ কী। দিনশেষে পরিবারই আসল।’

তবে সমালোচনা ও বিতর্ক থাকলেও আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর কোনো সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষমতা শেখ হাসিনার রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পাবেন, সে সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার ওপরই নির্ভর করছে।

Leave A Reply


Math Captcha
7 + 1 =