জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম ও দুর্নীতি করে যারা, তারাই সবচেয়ে বড় ‘গুপ্ত’। তিনি বলেন, মানুষ আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাবে, সন্তানরা ভালো শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, চাঁদাবাজি-ঘুষ-দুর্নীতি নির্মূল হবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। কিন্তু এখনো সেই পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে লংমার্চের বিশাল গাড়িবহর লালদীঘির পাড়ে পৌঁছালে নেতাকর্মীরা স্লোগান দিয়ে তাদের স্বাগত জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জনগণ দুটি ভোট দিয়েছিল। একটি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচনের উদ্দেশ্যে। নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল এবং ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি কতটা রাখা হয়েছে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, তখন বাংলাদেশের মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল এবার পরিবর্তন আসবে। দেশে আর ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না, আদালতে গেলে মানুষ শোষণ-বঞ্চনার শিকার হবে না এবং ন্যায়বিচার পাবে। সন্তানরা ভালো শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, তারা দেশ গড়বে। চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি নির্মূল হবে। কিন্তু এর একটিও বাস্তবায়ন হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, একসময় বলা হয়েছিল অনির্বাচিত সরকার যত দ্রুত বিদায় নেবে, দেশের তত মঙ্গল হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অনির্বাচিত সরকারের সময়ে মানুষ যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি ছিল, সেগুলো কি এখন দূর হয়েছে?
ঢাকা বিমানবন্দরে এক প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, কয়েক দিন আগে তিনজন ছিনতাইকারী একজন প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার সময় নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়েছিল। পরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারা বিএনপির লোক বলে পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বলেন, নিজের পরিচয় গোপন করে যারা অপকর্ম ও দুর্নীতি করে, তারাই সবচেয়ে বড় ‘গুপ্ত’।
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যার সমাধান বর্তমান সরকারের পক্ষে সম্ভব না হলে জনগণের কাছে তা স্বীকার করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সরকারের কাছে দেশ পরিচালনার সঠিক পরিকল্পনা নেই। বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে দেশ পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, পতিত স্বৈরাচার যাতে দেশে ফিরে আসতে না পারে, সে পথ তারা তৈরি করছেন না। একইভাবে বাংলাদেশে নতুন কোনো স্বৈরাচারের জন্মের পথও তৈরি হতে দেওয়া হবে না। জনগণ সমস্যার সমাধান না পেলে বিকল্প শক্তির সন্ধান করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদকে কার্যকর না করায় আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে। প্রথম থেকেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সেখানে আলোচনা করা হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের যথাযথভাবে কাজ করতে না দিয়ে সংসদকেও একদলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নতুন করে জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও প্রতারণার পরিণতি সরকার ও সংশ্লিষ্ট দলকে ভোগ করতে হবে। আগের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও এবার সে ধরনের দীর্ঘ অপেক্ষা করা হবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, গোটা বাংলাদেশ আজ বিস্ফোরণময় পরিস্থিতিতে রয়েছে। জনগণ রাস্তায় নামলে ১১ দলের ঐক্যেরও প্রয়োজন হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, গ্যাস সংকট নেই বলে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল নেই। মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো থাকলেও সাধারণ মানুষ সংকটে রয়েছে।
এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জনগণের দাবি আদায়ে বর্তমানে ছয় দফা নিয়ে আন্দোলন চলছে। এসব দাবির বিষয়ে জবাবদিহি না হলে তা এক দফা দাবিতে পরিণত হবে। তিনি বলেন, যেসব পরিবার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে রয়েছে এবং যাদের সন্তানরা নানা সংকটে পড়াশোনা করতে পারছে না, তাদের দাবিতেই এই লংমার্চ।
১১ দলীয় জোটের লংমার্চ চট্টগ্রামে পৌঁছানোর আগেই ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। শনিবার দুপুরের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। সন্ধ্যার পর লালদীঘি ময়দানের পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর অবস্থান দেখা যায়।
চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার, কোতোয়ালী মোড়, কাজীর দেউড়ি, লাভলেইন, সিআরবি মোড়, টাইগারপাস ও আন্দরকিল্লা এলাকায় মিছিলের কারণে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন। তাদের হাতে ছিল ছয় দফা দাবি-সংবলিত পোস্টার, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার।
সমাবেশ ঘিরে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আশপাশের এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ডগ স্কোয়াড নিয়ে তল্লাশি চালাতেও দেখা যায়।
মাগরিবের আগ পর্যন্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী, এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক মোহাম্মদ মীর শোয়াইব, জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সদস্য জাফর সাদেকসহ আরও অনেকে।
এর আগে শনিবার সকাল সোয়া ৮টার পর রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ শুরু হয়।

