আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে ইরান-সমর্থিত হুতিদের লড়াই নতুন করে তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও মোখা বন্দরসহ বেশ কিছু কৌশলগত অঞ্চল দখলে নিয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রায় ৩ হাজার মানুষ এডেন উপসাগর পেরিয়ে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর দীর্ঘ সময় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকার পর হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে আবার বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়েছে। মোখা বন্দরসহ লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
সংঘাতে বাড়ছে হতাহত ও বাস্তুচ্যুতি
সাম্প্রতিক লড়াইয়ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে তাইজসহ ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চল। হুতিদের অগ্রযাত্রার মুখে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, অনেকে দ্বিতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অস্থায়ী শিবিরগুলোতে মানবিক সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
হুতিরা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও লোহিত সাগরের নৌপথে হামলার হুমকি জোরদার করেছে। অন্যদিকে সৌদি ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ইয়েমেন সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাতের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
সৌদিকে ৪৮ এফ-৩৫ দেওয়ার উদ্যোগ
ইয়েমেনে সংঘাতের মধ্যেই সৌদি আরবের জন্য বড় ধরনের সামরিক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও ৪৯টি সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম বিক্রির সম্ভাব্য প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। চুক্তিটির আনুমানিক মূল্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি যোগাযোগ ও ক্রিপ্টোগ্রাফিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই বিক্রি সৌদি আরবের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াবে এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনবে না।
তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মার্কিন আইনের আওতায় কংগ্রেসের পর্যালোচনার পর এর পরবর্তী প্রক্রিয়া এগোবে।
এফ-৩৫ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের কাছে রয়েছে। সৌদি আরবকে একই যুদ্ধবিমান দেওয়ার উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছে কিছু বিশ্লেষক।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তৎপরতা
ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা শুধু সৌদি আরব নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাব আল-মানদেব ও লোহিত সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রয়েছে। হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হওয়ায় এসব নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ইরানের ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য চীনের কাছে আহ্বান জানিয়েছে। বেইজিংও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুরোধ জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হওয়া সংঘাত দেশটির দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত এফ-৩৫ বিক্রি এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে।
