কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উদ্বেগকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, এআই কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতোমধ্যে রয়েছে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, এআই নিয়ন্ত্রণে আলাদা কোনো ‘গার্ডরেল’ বা নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজন নেই। তাঁর ভাষায়, এআইয়ের জন্য প্রয়োজন একজন ‘শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান’ প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে এআই উন্নয়নের গতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে এর সুবিধা চীন পেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত সপ্তাহে অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এআই প্রযুক্তি চলতি দশকের শেষ নাগাদ মানবজাতির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এরপর সোমবার বিভিন্ন বাজারে এআই-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর কমে যায়। খাতটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি কমিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে অথবা আগামী সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প এআই কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। সেখানে এআই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। তিনি বলেন, শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলো নিজেরাই সরকারের কাছে নিয়ন্ত্রণের অনুরোধ করছে, বিষয়টি তাঁর কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ট্রাম্পও এআই খাত নিয়ন্ত্রণের দাবিকে ‘ভাঁওতা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের নিয়ন্ত্রণ প্রস্তাব
এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোডেই উন্নত এআই মডেলের জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছেন। শনিবার প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি ‘ফ্রন্টিয়ার’ মডেল নামে পরিচিত সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থার স্বাধীন নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।
এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা কমিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সময় তৈরির জন্য তিন ধাপের একটি কাঠামোও প্রস্তাব করেছেন তিনি। এ উদ্যোগকে এআই খাতের আরও কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী সমর্থন করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে আমোডেই ও অল্টম্যানের সঙ্গে সপ্তাহান্তে আলোচনা করেছেন মার্কিন সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার। অন্যদিকে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংও এআই নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, কোম্পানিগুলো চাইলে প্রযুক্তির উন্নয়ন সাময়িকভাবে ধীর করার মতো পদক্ষেপ স্বেচ্ছায় নিতে পারে।
একই অনুষ্ঠানে হুয়াংকে ফোন করেন ট্রাম্প। প্রায় পাঁচ মিনিটের ফোনালাপে ট্রাম্প এআই ডেটা সেন্টারকে অর্থনৈতিক সম্পদ তৈরির বড় উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। এগুলোকে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের ‘তেল’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এআই উন্নয়নের সমালোচকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, তাঁদের অবস্থান এমন ব্যক্তিদের সুবিধা করে দিচ্ছে যারা এ প্রযুক্তির অগ্রগতি থামাতে চায়। এর মধ্যে রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং চীনও থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এআই ও প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর প্রতি তাঁর অবস্থান মোটের ওপর ইতিবাচক। তবে এআই নিরাপত্তা নিয়ে অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের বিরোধ রয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর প্রশাসন অ্যানথ্রপিকসহ এআই খাতের কিছু ব্যক্তির ‘খারাপ বা সম্ভাব্য ক্ষতিকর’ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অ্যানথ্রপিককে কিছু সামরিক চুক্তি থেকে বাদ দিয়েছেন। দেশটির অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারে অ্যানথ্রপিক তাদের ক্লড এআই মডেল ব্যবহারের অনুমতি দিতে রাজি না হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে মামলা করে অ্যানথ্রপিক। গত ২৭ আগস্ট একটি মামলায় কোম্পানিটির পক্ষে রায় দেন মার্কিন এক বিচারক।
এদিকে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের কথা রয়েছে। এর আগে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে পৃথক বৈঠকের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিল রয়টার্স।
সূত্র: রয়টার্স

