Friday, September 18

দেশ থেকে পাচার হওয়া প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থের সন্ধানে নেমেছে সরকারের একাধিক সংস্থা। প্রাথমিক তদন্তে এই অর্থের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে বিএফআইইউ ইতোমধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শেষ করেছে। একই ঘটনায় অনুসন্ধান ও তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)সহ সরকারের আরও কয়েকটি সংস্থা।

বিএফআইইউর গত জুন পর্যন্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে প্রথম ধাপে ১০টি বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাচার করা প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে চূড়ান্ত তদন্ত শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। এখন মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

এ ছাড়া আরও ৪২টি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের পাচার করা প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে প্রাথমিক তদন্ত শেষে অধিকতর তদন্ত শুরু হয়েছে।

যে দেশগুলোতে পাচারের অর্থের সন্ধান

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের বড় অংশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো, পানামা ও পাপুয়া নিউগিনিসহ বিভিন্ন দেশে গেছে।

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ দেশেই রয়েছে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। সন্দেহজনক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে কোনো কোনো হিসাব জব্দের মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে।

তদন্তে এগোচ্ছে যৌথ টাস্কফোর্স

সমন্বিত যৌথ টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ উদ্ধারে বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থের তথ্য পাওয়া গেছে।

এরই মধ্যে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ কিংবা জব্দ করা হয়েছে। অন্তত ১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তদন্তের আওতায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা, সাবেক আমলা এবং ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের নামও রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।

বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানিয়েছেন, ১০টি বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। আরও ৪২টি প্রতিষ্ঠানের অর্থ উদ্ধারে বিদেশি আইন ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে।

তিনি জানান, আরও কয়েকশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবও তদন্তের আওতায় এসেছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদেশে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান

এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) পরিচালিত অনুসন্ধানেও বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, অস্ট্রিয়া, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, সেন্ট লুসিয়া ও তুরস্কের সাতটি শহরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পাচার হওয়া সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

সরকার পরিবর্তনের পর ছয় শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং ৯ হাজারের বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলেও নথিপত্রের বরাতে জানা গেছে।

অর্থ ফেরানো কঠিন ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত বিশ্বে পাচার হওয়া অর্থের খুব সামান্য অংশই শেষ পর্যন্ত ফেরত আনা সম্ভব হয়।

তাঁর ভাষ্য, পাচার হওয়া অর্থের মাত্র এক শতাংশের মতো ফেরত আনতে সক্ষম হয় উন্নয়নশীল দেশগুলো। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ ফেরাতে সাত-আট বছর বা তারও বেশি সময় লাগে।

বাংলাদেশ এর আগে সিঙ্গাপুর থেকে একবার পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে পেরেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই প্রক্রিয়াতেও প্রায় সাত বছর সময় লেগেছিল।

ইফতেখারুজ্জামানের মতে, অর্থ ফেরত আনা জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়, সেসব দেশের আর্থিক ও আইনি কাঠামোর কারণে পাচার হওয়া অর্থের সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকে।

তিনি আরও বলেন, পাচার করা অর্থকে বিদেশে বৈধ বিনিয়োগ বা বৈধ সম্পদ হিসেবে দেখানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইন ফার্ম ভূমিকা রাখে। পরে একই অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াতেও কখনো কখনো এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাতে হয়।

যাদের নাম তদন্তে এসেছে

বিএফআইইউ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদন্তে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও মন্ত্রীদের মধ্যে আমির হোসেন আমু, দীপু মনি, আসাদুজ্জামান খান কামাল, নসরুল হামিদ বিপু, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শামীম ওসমান, হাছান মাহমুদ, আসাদুজ্জামান নূর, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, এ এইচ এম মোস্তফা কামাল, টিপু মুনশি, জুনাইদ আহমেদ পলক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, মো. তাজুল ইসলাম, আ ফ ম রুহুল হক, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহার, মমতাজ বেগম ও বিপ্লব কুমার সরকারের নাম রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল্লাহ আল মাসুদ, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, পারভেজ তমাল, মোহাম্মদ আদনান ইমাম এবং নাফিসা কামালের নামও তদন্তসংশ্লিষ্ট তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে তালিকায় নাম থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে

তদন্তসংশ্লিষ্ট তালিকায় এশিয়াটিক টকিং পয়েন্ট কমিউনিকেশনস লিমিটেড, অপটিমাম সার্ভিস লিমিটেড, ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস, এশিয়াটিক টিএমএস, ব্ল্যাকবোর্ড স্ট্র্যাটেজিজ, কুকি জার, স্টেনসিল বাংলাদেশ, এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস, ২৪ টিকিট, আকাশ নীল, ই-অরেঞ্জ, আলিশা মার্ট, আলিফ ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং লিমিটেড, দালাল প্লাস ডটকম, ধামাকা, আনন্দের বাজার, অ্যামাস বিডি, ওয়ালমার্ট, রিং আইডি বিডি লিমিটেড ও থলে ডটকমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের এসব অভিযোগের বিষয়ে একাধিক সরকারি সংস্থার তদন্ত চলমান। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত, জব্দ এবং দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা কতটা পাওয়া যায়, এখন সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে তদন্তে উঠে আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 31 = 35