Friday, September 18

চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ডেনমার্কভিত্তিক মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস এ প্রকল্পে ৭৬ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা, বিনিয়োগ করছে।

কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়া চর এলাকায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে গুপ্তা বাঁকের পরবর্তী এলাকায় টার্মিনালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের জন্য ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় গত ২২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিকে প্রকল্পের জমি বুঝিয়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালুর কথা। এরপর ৩০ বছর এটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালসের স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড। চুক্তির সময় প্রকল্পটিতে ৫৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা জানানো হলেও পরে তা বেড়ে ৭৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই অর্থে টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।

প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ টার্মিনালে সাতটি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ প্রায় ৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি থাকবে। এসব যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ বিদ্যুৎচালিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে। লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে এতে আরও প্রায় ৯ লাখ টিইইউএস সক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৪৪ লাখ টিইইউএস হবে।

লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ। বর্তমানে বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের এবং ২ হাজার ৮০০ টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়ায় সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের প্রায় ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে একসঙ্গে তিনটি তুলনামূলক ছোট অথবা দুটি বড় জাহাজ ভেড়ানো যাবে।

ডিবিএফওটি (ডিজাইন, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও হস্তান্তর) ভিত্তিতে গ্রিনফিল্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মোট জমির মধ্যে ৩২ একর এলাকায় মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং প্রায় ১০ একর এলাকায় ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা থাকবে। টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে ৮ লাখ টিইইউএস।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে টার্মিনাল নির্মাণে সরাসরি কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম ৮ লাখ কনটেইনারের প্রতিটির জন্য ২১ ডলার এবং ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারের জন্য ২৩ ডলার পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ২৫০ কোটি টাকা ফি পাওয়ার কথা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়ত হামিম বলেন, ‘এটি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর আরও চারটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করেছে। নতুন এ কনটেইনার টার্মিনাল তৈরির মধ্য দিয়ে অর্থনীতির নতুন এক মাইলফলক তৈরি হবে।’

এর আগে রবিবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে বড় মাইলফলক। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে উঠবে।

Leave A Reply


Math Captcha
47 − 44 =