চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৭১ মিটার উঁচু একটি টাওয়ার। একটু এগোলেই চোখে পড়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ক্ষুদ্র আদল। পাশে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। আরও ভেতরে আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল, লালবাগ কেল্লাসহ দেশের নানা ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতিরূপ।
দূর থেকে দৃশ্যটি এখনো আকর্ষণীয়। কিন্তু কাছে গেলেই বদলে যায় সেই চিত্র। কোথাও ভেঙে পড়েছে লোহার সীমানাপ্রাচীর, বন্ধ ফটকে ঝুলছে তালা। জীর্ণ টিকিট কাউন্টার, হাঁটার পথে ঝোপঝাড়। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও ধরেছে ফাটল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কাচের টুকরো। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর প্রতিরূপে জমেছে সবুজ শেওলার আস্তরণ।
এটি চট্টগ্রামের বহুল পরিচিত ‘মিনি বাংলাদেশ’। একসময় ‘স্বাধীনতা পার্ক’ নামে পরিচিত এই বিনোদনকেন্দ্রের বর্তমান নাম ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। কিন্তু নাম বদলালেও বদলায়নি এর বেহাল দশা। গত প্রায় দুই বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে প্রায় ১৬ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্স।
বিদ্যুৎ নেই। পানি জমে তৈরি হয়েছে মশার প্রজননক্ষেত্র। পার্কের ভেতরে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে একসময় যে জায়গায় শিশু-কিশোর ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকত, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা ও অযত্নের চিত্র।
ফিরবে কি পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য?
সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা কমপ্লেক্সে প্রতীকী পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেন। তবে এতে পার্কের দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।
তবে পার্কটি পুনরায় চালুর বিষয়ে আশাবাদী জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের এই পার্ক আগামী দেড় মাসের মধ্যে চালুর বিষয়ে মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। নতুন একজন ইজারাদার খোঁজা হচ্ছে। ইজারাদার স্থাপনাগুলো মেরামত করে পার্কটি পরিচালনা করবেন এবং জেলা প্রশাসন এর তত্ত্বাবধান করবে।
৫৬ কোটি টাকার প্রকল্প
প্রায় ১৬ একর জায়গার ওপর ২০০৬ সালে গড়ে তোলা হয় কমপ্লেক্সটি। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির পরিকল্পনা ছিল ব্যতিক্রমী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকে ক্ষুদ্র পরিসরে এক জায়গায় তুলে ধরাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কমপ্লেক্সটির উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠার সময় নাম ছিল ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামেই বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে।
একসময় দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ দেখতে এখানে ভিড় করতেন দর্শনার্থীরা। শিশুদের জন্য ছিল নানা ধরনের বিনোদন ব্যবস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে এখন সেই পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্যের চিহ্নও অনেকটাই মুছে গেছে।
মলিন হয়ে গেছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতিরূপ
কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর প্রতিরূপগুলোর অবস্থাও নাজুক। আহসান মঞ্জিলের চারপাশে আগাছা, দেয়ালের পলেস্তারা উঠে গেছে। কার্জন হলের বাইরের অংশে ফাটল ধরেছে, কোথাও জমেছে শেওলা।
জাতীয় সংসদ ভবনের ক্ষুদ্র সংস্করণও পড়ে আছে অযত্নে। জাতীয় স্মৃতিসৌধের চারপাশে বেড়ে উঠেছে ঘাস ও ঝোপঝাড়। লালবাগ কেল্লা, হাইকোর্ট ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রতিরূপেও ভাঙাচোরা অবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে আগাছা।
একই অবস্থা দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, বড় কুঠি, ছোট কুঠি ও সেন্ট নিকোলাস চার্চের প্রতিরূপগুলোরও।
একসময় এসব স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেন দর্শনার্থীরা। এখন অনেক স্থাপনার কাছে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
মরিচা ধরেছে বিনোদনের সরঞ্জামে
শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনাই নয়, বিনোদনকেন্দ্রের বিভিন্ন রাইডও এখন ধ্বংসের মুখে। টয়ট্রেনের পুরোনো রেলপথের অনেক অংশ নেই। কৃত্রিম জলাধারের পানিতে জমেছে শেওলার পুরু স্তর। ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেছে হাঁটার পথ।
রোলার কোস্টার, ফেরি হুইল, মেরি-গো-রাউন্ড ও বাম্পার কারে ধরেছে মরিচা। কোনো কোনো রাইডের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও নেই। দীর্ঘদিনের অযত্নে পুরো বিনোদনকেন্দ্রটি এখন যেন পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।
যেখানে একসময় শিশুদের হাসি-আনন্দে মুখর থাকত পরিবেশ, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা।
বিকল ৭১ মিটার টাওয়ার
কমপ্লেক্সের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রায় ৭১ মিটার বা ২৪ তলা উচ্চতার টাওয়ার। এর ওপরে ছিল ঘূর্ণায়মান রেস্টুরেন্ট। টাওয়ারের চূড়া থেকে চট্টগ্রাম শহর, বন্দর, কর্ণফুলী নদী ও আশপাশের এলাকার দৃশ্য দেখা যেত।
এখন সেই টাওয়ারও বিবর্ণ। লিফট নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাচের টুকরো। একসময়ের আকর্ষণীয় স্থাপনাটি এখন নিজেই অযত্ন ও অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিরাপত্তা নেই, বেতনও বাকি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কমপ্লেক্সে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর পরিচালনাকারীরা সরে গেলে বন্ধ হয়ে যায় বিনোদন পার্কটি। ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত এই বিনোদনকেন্দ্র আর নিয়মিতভাবে চালু হয়নি। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও।
কমপ্লেক্সের নিরাপত্তাকর্মী জোবায়ের উল্লাহ বলেন, তাঁদের নয় মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালে কখনো কখনো দুই-তিন হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, সীমানাপ্রাচীরের অনেক অংশও নেই। দিনে পরিস্থিতি যেমন, রাতে আরও খারাপ হয়ে যায় এবং নিরাপত্তাকর্মীরাও ভয়ের মধ্যে থাকেন।
‘পুরো জঙ্গল হয়ে গেছে’
এলাকাটি দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন মোহাম্মদ আজিম। তাঁর ভাষ্য, একসময় এটি জনপ্রিয় একটি বিনোদনকেন্দ্র ছিল। সন্তানদের নিয়ে তিনি নিয়মিত এখানে আসতেন। এখন পুরো জায়গাটি জঙ্গলের মতো হয়ে গেছে।
প্রায় দুই দশক আগে যে স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘মিনি বাংলাদেশ’, দীর্ঘদিনের অযত্নে সেই স্বপ্নের অনেকটাই এখন বিবর্ণ। সরকারি উদ্যোগে নতুন ইজারাদার নিয়োগ, স্থাপনাগুলোর সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কমপ্লেক্সটি আবারও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
