Saturday, November 7

সকাল গড়াতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অলিগলি ভরে ওঠে কোরবানির পশুর ডাক, তাকবিরের ধ্বনি আর ব্যস্ত মানুষের পদচারণায়। পবিত্র ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা ধারণ করে রাজধানীর আদাবর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও মিরপুরজুড়ে সকাল থেকেই শুরু হয় কোরবানির উৎসব।

কেউ গরুর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে আদর করছেন, কেউ শেষবারের মতো পশুর শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও শিশুদের উচ্ছ্বাস, কোথাও আবার চোখে জল নিয়ে পশুর প্রতি মায়া—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আবেগঘন এক পরিবেশ।

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের নামাজের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতে শুরু হয় পশু কোরবানি। বিকেল গড়ালেও নানা স্থানে চলতে থাকে কোরবানির কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি মহল্লায় কোরবানিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ধর্মীয় আবহ। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে তাকবির, বাসার ছাদ ও গলিতে চলছে প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যরা নতুন পোশাক পরে একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন কোরবানির আনুষ্ঠানিকতায়।

আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় কয়েকজন তরুণকে দেখা যায় কোরবানির আগে গরুকে পানি খাওয়াতে। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম না। এটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ আর হিংসাকে ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়।”

আদাবর এলাকায় সকাল থেকেই ছিল ব্যস্ততা। কেউ মাংস কাটছেন, কেউ আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের জন্য মাংস প্যাকেট করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন। আবার গরিবদের জন্য আলাদা অংশও প্রস্তুত রাখছেন অনেকে।

অনেক পরিবারকে দেখা গেছে কোরবানির মাংস আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি পথশিশু ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে। স্থানীয় গৃহিণী আইরিন আক্তার বলেন, “সারা বছর অনেক কষ্টে থাকা মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও কোরবানির আনন্দ আছে। শুধু মাংস না, ঈদের সৌন্দর্য তো সব কিছু ভাগাভাগি করার মধ্যেই।”

শ্যামলী ও কল্যাণপুর এলাকায় কয়েকটি স্থানে স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে। কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে সিটি করপোরেশনের কর্মীরাও সক্রিয় ছিলেন। কোথাও যেন দুর্গন্ধ বা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়দের সচেতনতাও ছিল চোখে পড়ার মতো।

ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। গরুর জন্য বিশেষভাবে তৈরি মালা বিতরণ করা হয়, যা পরে বড় ময়লার ব্যাগ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

আদাবরের স্থানীয় একটি মাদ্রাসা ও খানকার শিক্ষক ইদ্রিস আলী বলেন, “কোরবানির মূল কথা তাকওয়া। আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছায় না, পৌঁছায় মানুষের নিয়ত ও আন্তরিকতা। তাই কোরবানির পাশাপাশি নিজের চরিত্র ও মনকেও পরিশুদ্ধ করা জরুরি।”

মোহাম্মদপুর ও বছিলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট শিশুদের কৌতূহল নিয়ে কোরবানির কার্যক্রম দেখতে দেখা যায়। অনেকে বাবার সঙ্গে মাংস বিতরণেও অংশ নেয়। পরিবারগুলো শিশুদের কোরবানির ধর্মীয় তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করে।

মিরপুর-আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাইদুল হক বলেন, “প্রতিবছরই কোরবানির ঈদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু বিড়ম্বনা থাকে। তাই আমরা সকাল থেকেই টিম করে এলাকায় সচেতনতা তৈরি করছি।”

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানিকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতির চিত্রও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক জায়গায় কয়েক পরিবার মিলে ভাগে কোরবানি দিয়েছেন। তরুণরা স্বেচ্ছায় মাংস কাটা, পরিবহন ও বিতরণ কাজে অংশ নিয়েছেন।

আদাবরে ভাগে কোরবানি দেওয়া বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুজ্জামান আহমেদ বলেন, “ঈদ আমাদের ত্যাগ শিখায়। সামর্থ্যের মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দিচ্ছি। মেয়েকেও সঙ্গে রাখছি, যেন সে ছোটবেলা থেকেই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা জানতে পারে।”

Leave A Reply


Math Captcha
51 − = 49