Saturday, November 7

ঢাকা: সাম্য, মানবতা, বিদ্রোহ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অমর রূপকার, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। বাংলা সাহিত্যের এই মহান পুরুষকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এক বাণীতে কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

ত্রিশালে মূল অনুষ্ঠান: ‘নজরুল সিটি’র প্রস্তাব

জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হচ্ছে কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

শনিবার ত্রিশালের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রতীক।” কবির জীবন ও কর্মকে বিশ্বপরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে নির্দেশ দেন। অনুষ্ঠানে নজরুল গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য দুই গুণী ব্যক্তির হাতে ‘নজরুল পদক’ তুলে দেওয়া হয়।

রাজধানীতে বহুমুখী আয়োজন

রাজধানীতে বাংলা একাডেমি সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে “দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি” শিরোনামে তিন দিনব্যাপী বিশেষ উৎসবের আজ সমাপনী দিন। এছাড়া নজরুল ইনস্টিটিউটও পৃথক কর্মসূচি পালন করছে।

সাহিত্য জীবন ও কালজয়ী সৃষ্টি

১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুল বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ। সম্প্রতি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

  • সূচনা: ১৯১৯ সালে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক থাকা অবস্থায় তাঁর প্রথম গদ্য “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী” সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখান থেকেই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত।
  • বিদ্রোহী ও অগ্নিবীণা: ১৯২১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙ্গার গান’। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’। এই গ্রন্থের ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘কামাল পাশা’, ‘শাত-ইল্-আরব’ কবিতাগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
  • কারাগারে দোলনচাঁপা: রাজদ্রোহের অভিযোগে ১৯২৩ সালে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন কবি। প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় কারারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহায্যে তাঁর কবিতা বাইরে পাঠানো হয়, যা পরে ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এর মুখবন্ধ ছিল বিখ্যাত কবিতা “আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে”।
  • সংগীত ও নান্দনিকতা: নজরুল প্রায় ৪ হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন, যা ‘নজরুল গীতি’ নামে সমাদৃত। বাংলা কাব্যে তিনি প্রথম ‘গজল’ ধারার প্রবর্তন করেন। পাশাপাশি অসংখ্য উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত ও ভক্তিগীতিও রচনা করেন। শিশুদের জন্য তাঁর ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’, ‘লিচু-চোর’ আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

শেষ জীবন ও সমাহিতকরণ

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সশ্রম মর্যাদায় সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট এই মহান কবি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

বর্তমান বিশ্বের বৈষম্য, বিদ্বেষ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে নজরুলের সাম্য ও মানবতার দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 1 = 7