Sunday, November 8

সকাল গড়িয়ে দুপুর। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকায় একটি পাঁচতলা ভবনের ভাঙা ইটের স্তূপের পাশে পুরোনো বস্তার ওপর বসে ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙছেন এক বৃদ্ধা। বয়স প্রায় ৭০ ছুঁইছুঁই। রোদে পোড়া মুখ, কাঁপা হাত আর ক্লান্ত চোখ—তবু থামে না কাজ। কারণ, কাজ থামলেই থেমে যাবে খাবার ও ওষুধের জোগান।

এই বৃদ্ধার নাম আনোয়ারা বেগম (৬৯)। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই গ্রামের বাসিন্দা তিনি। প্রায় ১৪ বছর ধরে শ্রমজীবী এই নারী স্বামী হারানোর পর ইট ভেঙেই চালাচ্ছেন জীবিকা।

আনোয়ারা বেগম বলেন, “আমি না খাইয়া থাকলেও কারো কাছে হাত পাতি না। আমার শরম করে। কাম করলে টাকা পামু, টাকা পাইলে খাওন আর ওষুধ পামু।”

জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে পথ চলা তার। চাচাতো ভাই রেফাজউদ্দীন ভূঁইয়ার সঙ্গে বিয়ের পর তিস্তা নদীর ভাঙনে হারিয়ে যায় তাদের সব সহায়-সম্পদ। পরে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন তারা। প্রথমে স্বামী রিকশা চালাতেন, পরে লেবারের কাজ করতেন। অল্প আয়ে কোনোভাবে চলছিল সংসার।

কিন্তু ২০০৮ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন স্বামী। চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান তারা। সেই সময়ই সংসার চালাতে ইট ভাঙার কাজ শুরু করেন আনোয়ারা। চার বছর অসুস্থ থাকার পর ২০১২ সালে মারা যান তার স্বামী।

ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে গভীর বেদনা। তার দুই সন্তান জন্মের পর বাঁচেনি। পরে একটি পালক কন্যা নিলেও এক বছর পর তাকেও হারান তিনি। ফলে এখন পৃথিবীতে বলতে গেলে একেবারেই একা আনোয়ারা বেগম।

স্বামী মারা যাওয়ার পর পাইনাদীতে একটি ছাপড়া ঘরে অন্যদের সঙ্গে থাকতেন তিনি। পরে সবাই চলে গেলে একা হয়ে পড়েন। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম রাব্বানীর পরিবারের সহযোগিতায় তাদের বাড়ির একটি কক্ষে বসবাস করছেন তিনি।

বয়সের ভারে এখন আগের মতো কাজ করতে পারেন না আনোয়ারা। তবু প্রতিদিন ইট ভেঙে প্রায় ১৫০ টাকা আয় করেন। এই সামান্য আয়ে চলে তার খাবার ও ওষুধের খরচ। তিনি আলসারসহ নানা রোগে ভুগছেন। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, যার খরচ তার সামর্থ্যের বাইরে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা—তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। ফলে সরকারি কোনো সহায়তা, যেমন বয়স্ক ভাতা, পান না তিনি। ২০০৮ সালে ভোটার হওয়ার জন্য তথ্য দিলেও পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে পারেননি। পরে সেটি আর তোলা হয়নি।

তিনি বলেন, “আইডি কার্ড দিয়া কী হইব? আমারে কে বয়স্ক ভাতার কার্ড কইরা দিব?”

বিশ্ব শ্রমিক দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে তার সরল উত্তর, “শ্রমিক দিবস আমি বুঝি না। আমি বুঝি, কাম করলে টাকা পামু।”

স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম রাব্বানী বলেন, “আনোয়ারা খালা খুব আত্মসম্মানী। কষ্টে থাকলেও কখনও কারো কাছে কিছু চান না। বয়স হওয়ার পরও নিজের খরচ চালাতে কাজ করেন। আমরা যতটুকু পারি সাহায্য করি।”

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, “এটি শুধু একজন মানুষের কষ্টের গল্প নয়, এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও সতর্কবার্তা। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তিনি সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

আনোয়ারা বেগমের মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Leave A Reply


Math Captcha
− 1 = 7