Sunday, November 8

ঋতুচক্রের অনিবার্য আবর্তনে জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে চলেছে আরেকটি বাংলা বছর। চৈত্রের প্রখর দুপুরে শুকনো পাতার মৃদু শব্দ যেন বিদায়ের সুর তোলে; সেই সুরে মিশে থাকে নতুনের আহ্বান। বিদায় ও আগমনের এই সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে চৈত্র সংক্রান্তি—যা বাংলার মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের এক গভীর প্রতীক।

আজ বাংলা সনের অন্তিম দিন—৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। এটি কেবল একটি পঞ্জিকার সমাপ্তি নয়; দীর্ঘ বছরের ক্লান্তি ও গ্লানিকে মুছে ফেলার প্রতীকী মুহূর্ত। নতুন উদ্যমে জীবনকে পুনরারম্ভ করার এক অন্তর্লীন প্রেরণা জাগায় এই দিন। তাই এটি শুধু বিদায়ের দিন নয়, বরং নবসূত্রে গাঁথার এক নীরব অঙ্গীকার।

অঞ্চলভেদে আচার-অনুষ্ঠানে ভিন্নতা থাকলেও চৈত্র সংক্রান্তির মর্মকথা এক—ঐতিহ্যের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ। একসময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অংশগ্রহণে দিনটি পেয়েছে সার্বজনীন স্বীকৃতি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তিনদিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষকে বরণ করে নেয়।

গ্রামবাংলায় পুরনো বছরের দুঃখ ও ব্যর্থতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। ব্যবসায়িক জীবনে পুরনো হিসাব চুকিয়ে ‘হালখাতা’ খোলার প্রথাও নতুন সূচনার প্রতীক।

খাদ্য সংস্কৃতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব। নিরামিষ আহার, ১৪ প্রকার শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ রান্না, কোথাও ছাতু খাওয়ার প্রচলন—সবই এই দিনের ঐতিহ্য। চৈত্র মাসে রোগবালাই থেকে সুরক্ষার জন্য তেতো ও শাকসবজি খাওয়ার রীতিও বহমান।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রতপালন, শিবপূজা এবং বিভিন্ন আচার পালনের মধ্য দিয়ে তারা দিনটি উদযাপন করেন। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন ভবিষ্যতের শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে ওঠে।

সময়ের প্রবাহে শহুরে জীবনে রূপ বদলালেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ এখনো টিকে আছে। মেলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, পটচিত্র, যাত্রাপালা ও লোকসংগীত দিনটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে নানা আয়োজন করে থাকে।

এ বছরও দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি–তে অনুষ্ঠিত হবে লোকশিল্প প্রদর্শনী। প্রায় ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনায় ধামাইল নৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।

অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় পরিবেশিত হবে জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠ। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা আয়োজনকে বহুসাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করবে। লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’, যা দর্শকদের সামনে তুলে ধরবে গ্রামীণ জীবনের চিরন্তন রূপকথার আবহ।

Leave A Reply


Math Captcha
58 − = 51