Friday, November 6

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ডিসেম্বরকে ঘিরে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দলীয় নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করা, পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার পাশাপাশি ডিসেম্বরকে ‘টার্গেট’ করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে।

ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছক কষছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। নারায়ণগঞ্জের পলাতক নেতা শামীম ওসমানও ডিসেম্বরে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিজেদের শক্তির জানান দিতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গত দুই সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছে। বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জের এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে সব ইউনিটকে সতর্ক করে মাঠপর্যায়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে।

ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির পুরো টিমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ওই টিমে সদস্য ছিলেন ২৭ জন।

বিশ্লেষক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, জুলাই-আগস্টের গণহত্যার পর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে আওয়ামী লীগের দ্রুত দেশে ফিরে এসে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়া সহজ হবে না। তাদের মতে, ডিসেম্বরকে ঘিরে তৎপরতা মূলত নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল হতে পারে। তবে যে কোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা ব্যাপক দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের অনেক টাকা আছে। টাকা খরচ করে তারা দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চালাতে পারেন। তবে তারা সফল হতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন না।

তার মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণহত্যার ঘটনা দেশের মানুষের মনে এখনো টাটকা। নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি সহানুভূতি বা সমর্থন নেই। তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

জানা গেছে, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার নেতাকর্মীরা পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে তারা দেশ-বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে তহবিল গঠনের অভিযোগও রয়েছে।

পুলিশের এক অতিরিক্ত আইজি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিপুলসংখ্যক কনস্টেবল, এসআই ও এএসপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো আওয়ামীপন্থি অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে আলোচনা আছে। তাদের কারও কারও সঙ্গে বিদেশে পলাতক সাবেক সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, রাজধানীর ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনটির কিছু কর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও এসব এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এবং অর্থনৈতিক ভিত সচল রাখতে আত্মগোপনে থাকা অনেকে বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। কেউ রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ বিউটি পার্লার বা মোটরসাইকেলের শোরুম দিয়েছেন। কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিও নিয়েছেন। কিছু অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগও রয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা বিদেশে থাকা যেসব নেতার সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, এনামুল হক শামীম, জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নজরুল ইসলাম বাবু ও পিরোজপুরের মহিউদ্দিন মহারাজসহ আরও কয়েকজন।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো এবং গোপন নাশকতার প্রস্তুতির অগ্রিম বার্তা হিসেবে দেখছেন গোয়েন্দারা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে অস্থিরতা ও নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাও আগের তুলনায় বেড়েছে। জনগণের সহযোগিতায় যে কোনো বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়নি। আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ ছদ্মবেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অবস্থান করে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন।

তারা টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়মিত তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। বিশেষ উদ্দেশ্যে কোনো মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার কথা মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার একটি কৌশল হতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাতারাতি বা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা সহজ নয়।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলের দায়ভার এবং মানুষের ক্ষোভের বিপরীতে আওয়ামী লীগ কীভাবে সাধারণ মানুষের সামনে দাঁড়াবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। যে দল বা ব্যক্তির কারণে দেশে চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভীতি তৈরি হয়েছিল, তারা খুব সহজে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসতে পারবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।

Leave A Reply


Math Captcha
28 + = 38