Friday, November 6

প্রথম বাংলাদেশি ও বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন পরিব্রাজক নাজমুন নাহার। গত ৭ আগস্ট ২০২৬ হিমালয়ের দেশ ভুটান সফরের মধ্য দিয়ে তিনি ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের গৌরব অর্জন করেন।

২৬ বছরের বিশ্বভ্রমণ অভিযাত্রায় নাজমুন নাহার ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন। বিশ্বের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, দুর্গম পাহাড়, মরুভূমি, সমুদ্র, মহাসাগর, দ্বীপাঞ্চল এবং নানা ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থানে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে ধরেছেন।

নাজমুন নাহার এককভাবে বিশ্বভ্রমণকারী হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের সব ল্যান্ডলকড দেশ তিনি সড়কপথে ভ্রমণ করেছেন। দীর্ঘ স্থলপথ ও দুর্গম সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে বহুবার জীবনঝুঁকি ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও থেমে যাননি। একের পর এক দেশের সীমান্ত পেরিয়ে এগিয়ে গেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে।

২০০০ সালে ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর বিশ্বভ্রমণ শুরু হয়। ২০১৮ সালের ১ জুন জিম্বাবুয়ে সফরের মাধ্যমে তিনি ১০০তম দেশের মাইলফলক অর্জন করেন। এরপর ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে সফরে ১৫০তম, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভানুয়াতু সফরে ১৭৫তম এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে ১৮৪তম দেশের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। সর্বশেষ ভুটান সফরের মধ্য দিয়ে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮৫-তে।

বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি প্রতিটি সফরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্জন তুলে ধরছেন নাজমুন। বিশ্বের শতাধিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বাংলাদেশের কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে ‘নো ওয়ার অনলি পিস, সেভ দ্য প্লানেট, স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’—শান্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বাল্যবিবাহ বন্ধের মতো সামাজিক বার্তাও প্রচার করছেন।

আন্তর্জাতিক মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। তরুণদের সাহস, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস, মানবিক মূল্যবোধ ও স্বপ্নপূরণে অনুপ্রাণিত করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বক্তব্য দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক টেডএক্স প্ল্যাটফর্মেও বক্তব্য দিয়েছেন নাজমুন।

মানবিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। বিভিন্ন সংগঠনের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যভিত্তিক ২৬টি চ্যারিটি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘সাফার ফর পিস’-এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। গাজাসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের শিশুদের সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ ও মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশে ৭০টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন নাজমুন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন। ২০১৮ সালে জাম্বিয়া সরকার তাঁকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ এবং ২০২৩ সালে সেন্ট লুসিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ জোসেফ পিয়ের ‘ব্রেভ গার্ল’ উপাধিতে সম্মানিত করেন।

লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া নাজমুন নাহার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটিতে ‘এশিয়ান স্টাডিজ’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া’ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন।

১৮৫তম দেশ হিসেবে ভুটান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা জানিয়ে নাজমুন নাহার বলেন, ভুটানের পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। পারো, থিম্পু, পুনাখা, ডোচুলা, বুমথাং, ফোবজিখা ও হা ভ্যালিতে তিনি বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন।

নাজমুন বলেন, ভুটান তাঁর জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারাস ভ্রমণ। প্রতিটি স্থানই অপূর্ব পাহাড়, হিমালয়ের পর্বতশ্রেণি, সবুজ উপত্যকা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির কারণে ভুটান তাঁর কাছে অসাধারণ এক নান্দনিক দেশ।

১৮৫টি দেশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে নাজমুন নাহার বাংলাদেশের পতাকা, স্বাধীনতার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নারীশক্তিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন। সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বিশ্বের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তাঁর এই দীর্ঘ অভিযাত্রা বাংলাদেশের নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

Leave A Reply


Math Captcha
− 9 = 1