আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে পুলিশের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার, এমনকি পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক দিয়ে নিরীহ মানুষকে ফাঁসানোর মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছিল। পুলিশের একটি অংশ ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারের মতো আচরণ করেছে, এমন অভিযোগও ছিল বিভিন্ন সময়ে।
ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশে নেতৃত্বের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের পরও প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ কি আদৌ বদলেছে, নাকি পুরোনো সংস্কৃতিই নতুন বাস্তবতায় বহাল রয়েছে?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন এখনো আসেনি। ক্ষমতাসীনদের প্রভাব, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো এবং জবাবদিহির ঘাটতি অনেকাংশেই আগের মতো রয়েছে। তাদের মতে, শুধু কর্মকর্তা পরিবর্তন করে পুলিশের কাঠামোগত সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন নীতিগত ও আইনি সংস্কার।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, পুলিশের রাজনীতিকরণের জায়গায় ন্যূনতম পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষ্য, বাহিনীতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি এবং এ বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগও নেই। তবে মামলা ও জিডি নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় জনগণের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয় হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এখনো আগের মতোই চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ এখনো পুরোনো ধাঁচে চলার মানসিকতা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনের পর যে সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি এখনো দৃশ্যমানভাবে পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, পুলিশকে পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত আইন ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি। বর্তমানে পুলিশ ১৮৬১ সালের পুরোনো আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। একটি স্বাধীন ও আধুনিক আইন প্রণয়নের পাশাপাশি নিয়োগ, পদায়ন, চাকরির নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের কাজ যেন সরকারের অন্ধ নির্দেশ বাস্তবায়ন না হয়ে জনগণের স্বার্থে পেশাদারভাবে পরিচালিত হয়, সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা বাড়তি সুবিধা পেতেন। বিপরীতে বিএনপি জামায়াত সমর্থক হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের ডাম্পিং পোস্টিং, পদোন্নতি আটকে রাখা কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর অভিযোগ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও দলীয় আনুগত্য ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহম্মেদ বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় অনুগত কর্মকর্তাদের বাইরে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হতো না। ভুলক্রমে কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে চলে গেলেও তাকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হতো। ভালো পদে যেতে অনেককে মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে পুলিশের একজন এসপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগেও জেলার এসপি, রেঞ্জের ডিআইজিসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়নে দলীয় আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। এখনো অনেক ক্ষেত্রে একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এতে দক্ষ অনেক কর্মকর্তা বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পুলিশের বদলি ও পদায়নেও পুরোনো বাণিজ্যিক সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শকের নিরাপত্তায় থাকা এক বডিগার্ডের কথিত ‘বদলিবাণিজ্য’ সংক্রান্ত একটি অডিও ফাঁসের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক অডিওতে অর্থের বিনিময়ে বদলি এবং পদায়নের জন্য বিভিন্ন সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে।
পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। খুলনার শিরোমণি এলাকায় গত ৬ জুলাই রাতে একটি বাড়িতে ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ লাইন্সে কর্মরত কনস্টেবল রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তিকে অস্ত্র নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে লুটপাট করতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজশাহীতে এক এসআইয়ের ঘুষ লেনদেন ও টাকা ভাগাভাগির কথিত অডিও ফাঁস হওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একইভাবে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ওসি মো. আবুল হাশেমের একটি অডিও ফাঁসের পর তাকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই অডিওতে পুলিশের চাকরিকে ব্যবসার সঙ্গে তুলনা করে কথা বলার অভিযোগ ওঠে।
থানায় গিয়ে মামলা না নেওয়ার অভিযোগও এখনো রয়েছে। মগবাজারে ছিনতাইয়ের শিকার এক ব্যক্তি আহত অবস্থায় থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলেও প্রথমে পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন। পরে ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মামলা নেওয়া হয় এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যতার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, এমন অভিযোগও রয়েছে। রাজধানীর পল্লবী থানায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও পুলিশের কাছ থেকে ব্যবস্থা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন এক গৃহিণী। তার দাবি, অভিযোগ করার পর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা তার ওপর ফের হামলা চালায়।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের সঙ্গে ভিন্নমতও রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তার দাবি, অতীতে যেভাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, যথেচ্ছ গ্রেপ্তার কিংবা গুমের মতো ঘটনা ঘটত, পুলিশ এখন সেসব থেকে সরে এসেছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম বলপ্রয়োগ কীভাবে করা যায়, সে বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এই পরিবর্তনকে অনেক সময় নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সাধারণ মানুষের একটি অংশ এখনো মনে করে, পুলিশকে কঠোরভাবে বলপ্রয়োগ করলেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের নেতৃত্ব ও কিছু ক্ষেত্রে আচরণে পরিবর্তন এলেও নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্বের জায়গায় মৌলিক সংস্কার কতটা হয়েছে, সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কাঠামোগত ও আইনি সংস্কার ছাড়া পুলিশের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি বদলানো কঠিন।

