ঢাকার আজিমপুরে চাঞ্চল্যকর তাহিয়া তাসনিম ফিমা (১৯) হত্যা মামলার আসামি কাজী সাগরসহ দায়ীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ফিমার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বেলা ১১টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ফিমার বাবা মো. তাজুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য দেন। বক্তব্য দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তাজুল ইসলাম বলেন, বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়ে ভালো ছিল না। স্বামী তাকে মারধর ও নির্যাতন করতেন এবং ফিমা বিষয়টি তাঁর মাকেও জানিয়েছিলেন। নতুন পরিবেশে হয়তো পরিস্থিতি একসময় স্বাভাবিক হবে—এমন আশায় পরিবার অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি শুধু ফিমার জন্য আজ এখানে দাঁড়াইনি। দাঁড়িয়েছি অন্য ফিমাদের জন্যও, যাদের হত্যা করা হয়েছে এবং যাদের পরিবার ন্যায়বিচার পায়নি। আমি সেই সব বাবা-মায়ের জন্য দাঁড়িয়েছি, যারা সন্তান হারিয়েছেন।’
ফিমার হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, আসামি দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কাজী সাগরের এমন দণ্ড হওয়া উচিত, যা দেশে নারী হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেবে।
তিনি আরও বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার মামলাগুলো পুলিশকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে এবং আদালতকে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের জীবন ও নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
মানববন্ধনে ফিমার মা রিনা ইয়াসমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়েটিকে হত্যা করা হলো, তারপর থেকে আমরা থানার বারান্দায় ঘুরছি। কিন্তু চার্জশিট দিতে গড়িমসি করেছে পুলিশ।’
তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পরও মামলার কার্যক্রমে বিলম্ব হয়েছে। আসামিপক্ষ মামলাটি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার সন্তান হত্যার বিচার যেন আটকে না থাকে এবং আমাদের মতো কেউ যেন স্বজনহারা না হয়, তাই আমরা মানববন্ধন করে দ্রুত এই হত্যাকারীর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সয়দুজ্জামান বলেন, গত ২৬ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে ফিমাকে নির্যাতন ও গলাটিপে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। আসামি কাজী সাগরের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এখন বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ২০ মার্চ রাতে রাজধানীর আজিমপুরের বিসি দাস স্ট্রিটের একটি বাসা থেকে তাহিয়া তাসনিম ওরফে ফিমার (১৯) ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর তাঁর স্বামী কাজী সাগর আত্মগোপনে চলে যান।
পরে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীর সাক্ষ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ ফিমা হত্যাকাণ্ডে কাজী সাগরের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পায় বলে জানায়। এ ঘটনায় ফিমার বাবা তাজুল ইসলাম বাদী হয়ে কাজী সাগরকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ভারতের নদীয়া জেলার গাংনাপুর থানা এলাকায় কাজী সাগর, তাঁর বাবা কাজী মনিরুল হক ও সাগরের মামা জাফর মিয়াকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় পুলিশ। প্রায় ৪৫ দিন কারাগারে থাকার পর তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ফিমার পরিবারের অভিযোগ, দেশে ফেরার পর কাজী সাগর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে গোপনে বসবাস করছেন। দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে দায়ী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে পরিবার।

