Friday, November 6

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরিশোধনের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র বিতরণেও একাধিক ভুলের অভিযোগ উঠেছে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি সরকার স্বীকার করেছে। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের প্রশ্নপত্রেও অসংগতির অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।

শুধু প্রশ্নপত্রে ভুল নয়, বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণেও গরমিলের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরিবর্তে দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরীক্ষার ফলাফলের ওপর উচ্চশিক্ষায় ভর্তি ও কর্মজীবনের অনেক কিছু নির্ভর করে। ফলে প্রশ্নপত্রে সামান্য ভুল বা অসংগতি একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে প্রশ্নপত্র বিতরণে ভুল হলে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্তিতে পড়েন, যা পরীক্ষায় তাদের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলতে পারে।

পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি সরকার স্বীকার করেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। ভুল হওয়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র পরিশোধনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের ইংরেজি ভার্সনের নৈর্ব্যক্তিক অংশের তিনটি প্রশ্নেও অসংগতির অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, ওই প্রশ্নগুলোর বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। রসায়নের ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রেও অসংগতির অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকার উত্তরার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইংরেজি ভার্সনের এক পরীক্ষার্থী জানান, উচ্চতর গণিতের একটি প্রশ্নের বিষয় তাঁর জানা থাকলেও প্রশ্নটিতে অসংগতি থাকায় তিনি সেটির উত্তর দেননি। পাবলিক পরীক্ষা হওয়ায় ঝুঁকি না নিয়ে কম আয়ত্তে থাকা আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে তাঁকে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু বলেন, কোনো ভুলের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়, যাতে পরীক্ষার্থীরা নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধায় না পড়েন। তাঁর দাবি, পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে বড় ধরনের কোনো ভুল ছিল না। তবে বানান বা এ ধরনের কিছু ত্রুটি থাকতে পারে।

এদিকে প্রশ্নপত্র বিতরণেও একাধিক ভুলের ঘটনা ঘটেছে। ২৭ জুলাই দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় একটি কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষার ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা প্রথম পত্রের পরিবর্তে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। পরীক্ষার্থীরা বিষয়টি কক্ষ পরিদর্শককে জানালে ভুল প্রশ্নপত্র ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পাশের কেন্দ্র থেকে প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র এনে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এর আগে ১৫ জুলাই বগুড়ার শিবগঞ্জ সরকারি মোজাফ্ফর হোসেন কলেজ কেন্দ্রে গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্রে এ বছরের নিয়মিত ৪২ জন পরীক্ষার্থীর যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষা শেষে বিষয়টি জানতে পারেন শিক্ষার্থীরা। পরে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে লিখিত প্রতিবেদন পাঠায়। এ ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষা বোর্ড।

জামালপুরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। ৪ জুলাই সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি প্রশ্নপত্রে শতাধিক নিয়মিত শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ মীর শওকত আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। একই সঙ্গে কলেজের পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি বাতিল করা হয়।

চলতি মাসে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরেও ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে ১৪ পরীক্ষার্থীকে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ২ আগস্টের ওই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজের কেন্দ্র সচিব মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন খানসহ তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে প্রধান প্রশিক্ষকদের তালিকা থেকে প্রতিটি বিষয়ের জন্য চারজন প্রশ্ন প্রণয়নকারী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। তাঁরা পৃথকভাবে চার সেট প্রশ্নপত্র তৈরি করে বোর্ডে জমা দেন। এরপর চারজন পরিশোধনকারী বা মডারেটর গোপনীয়তার সঙ্গে প্রশ্নগুলো যাচাই করেন। প্রয়োজন হলে তাঁরা প্রশ্ন সংশোধন, সংযোজন কিংবা নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন।

যাচাই-বাছাই শেষে প্রশ্নপত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া হয় এবং গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়। এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলেও নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের জন্য মোট ৩৬ সেট প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরে লটারির মাধ্যমে চার সেট নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে দুই সেট ছাপার জন্য পাঠানো হয় এবং বাকি দুই সেট সংরক্ষণ করা হয়।

ছাপার পর প্রশ্নপত্র স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। জেলা সদরে সাধারণ ট্রেজারিতে এবং উপজেলায় সাধারণত থানায় প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে থাকে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু জানান, আগামী পরীক্ষায় দ্বিতীয়বার মডারেশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র পরিশোধনের সময় ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষকের পাশাপাশি একজন ইংরেজি ভাষার শিক্ষক রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকেই এই ব্যবস্থা শুরু হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রশ্নপত্রে ভুল বা অসংগতি এবং বিতরণে গরমিল কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রশ্ন প্রণয়ন, পরিশোধন, ছাপা, সংরক্ষণ ও পরীক্ষাকেন্দ্রে বিতরণ প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি ও মাননিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

কারণ, পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুল শুধু একটি প্রশ্নের ভুল নয়। এর সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি, ফলাফল এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের সম্ভাবনা জড়িয়ে থাকে। তাই শুধু ভুলের পর নম্বর সমন্বয় বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব ভুলের পেছনের ব্যবস্থাগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান করা জরুরি।

Leave A Reply


Math Captcha
53 + = 57