Friday, November 6

কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি:
ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া এবং অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথা বলে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন কারারক্ষীর বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ সহজ করা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া, হাসপাতালে পাঠানো কিংবা কারাগারের ভেতরে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্বজনদের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হয়। টাকা পাঠানোর পরও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত সুবিধা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

কারাগারের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, কয়েকজন কারারক্ষী এবং তাদের স্বজনদের নামে নিবন্ধিত মোবাইল আর্থিক সেবার নম্বরে নিয়মিত অর্থ লেনদেনের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব নম্বরে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জমা হয় এবং বন্দিদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে সংশ্লিষ্টরা কমিশন পান।

তবে কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ও জেলারের নেতৃত্বে এসব অনিয়ম পরিচালিত হচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘অসুস্থ ছেলের জন্য ৫ হাজার টাকা চাওয়া হয়’

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা কোহিনূর বেগম অভিযোগ করেন, তার ছেলে শাহাজামান কারাগারে অসুস্থ—এমন কথা বলে সালমান নামের এক কারারক্ষী তার কাছে ৫ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলেন।

কোহিনূর বেগম বলেন, টাকা পাঠানোর পর কারাগারে গিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে কিংবা তার বিষয়ে সঠিক তথ্য জানতে পারেননি। তবে ওই কারারক্ষী পরে তাকে একাধিকবার ফোন করে আরও টাকা চান বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষায়, “এই বিকাশ সিন্ডিকেট বন্ধ হওয়া দরকার।”

হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলেও টাকা চাওয়ার অভিযোগ

টাঙ্গাইল থেকে আসা সাদাত নামে এক ব্যক্তি জানান, তার ভাই সফিকুল ইসলাম সামাদ অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলে কারাগার থেকে বিকাশে টাকা চাওয়া হয়।

সাদাতের দাবি, ফোনে তাকে জানানো হয়, তার ভাই কারাগারের পদ্মা ভবনের ২/৮ নম্বর কক্ষে আছেন। কিন্তু পরে কারাগার ও হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও ভাইয়ের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি। এরপরও তার কাছে বারবার বিকাশে টাকা চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

‘বিভিন্ন সুবিধার কথা বলে আরও টাকা নেওয়া হয়’

দোহার এলাকার নিলয় নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, কারাগার থেকে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, তার ভাই গুরুতর অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে রাখতে হলে বিকাশে টাকা পাঠাতে হবে বলে জানানো হয়। পরে তিনি বাধ্য হয়ে টাকা পাঠান।

নিলয়ের অভিযোগ, টাকা পাঠানোর পরও বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে আরও অর্থ নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বন্দির স্বজন বলেন, কয়েক দফায় বিকাশে টাকা পাঠানোর পরও প্রতিশ্রুত সহযোগিতা পাননি তিনি।

ওই স্বজন বলেন, “ভেতরে আমাদের স্বজন বন্দি। তাই ভয়েও কিছু বলতে পারি না। যদি আমাদের বন্দির কোনো ক্ষতি হয়। দু-একটি অভিযোগ সামনে এলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু আবার মোবাইলের মাধ্যমে টাকা নেওয়া শুরু হয়।”

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, কারাগারের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে বন্দিদের বিভিন্ন সুবিধার কথা বলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ গুরুতর।

তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারাগারের ভেতরে বন্দিদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার নামে স্বজনদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত নম্বরে অর্থ নেওয়ার অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।

‘অভিযোগ বা প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা’

অভিযোগের বিষয়ে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ ও জেলার মাসুদ হাসান জুয়েলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. আশাদুল ইসলাম বলেন, কারাগারে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগগুলো কতটা সত্য এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

Leave A Reply


Math Captcha
5 + 1 =