Friday, November 6

জুলাই সনদকে কখনোই আরেকটি রাজনৈতিক ইশতেহার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি রূপরেখা হিসেবে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থাগত সংস্কারের দাবিগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়ার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা হিসেবেই সনদটি সামনে এসেছে।

সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই জনপরিসরে আলোচিত হয়ে আসছে। এসব সংস্কারমূলক উদ্যোগ নীতিগতভাবে সমর্থনযোগ্য বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলও দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করে প্রশংসার দাবিদার হলেও সংলাপ এবং সর্বসম্মত ঐকমত্য এক বিষয় নয়। কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করেছে, যদিও নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জুলাই সনদের মধ্যেই একাধিক মৌলিক প্রশ্নে মতপার্থক্যের বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হলেও প্রশ্নাতীত জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিফলন নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পার্থক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একটি অংশ বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যাতে এটি একটি চূড়ান্ত জাতীয় ম্যান্ডেট হিসেবে প্রতীয়মান হয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোট বা জনসমর্থনের মাধ্যমে সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্ভব এবং ভবিষ্যৎ সরকারগুলো নির্দিষ্ট একটি বাস্তবায়ন কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকবে।

তবে এ ধরনের ব্যাখ্যাকে অনেকেই অত্যন্ত সরলীকৃত এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। কারণ, গণভোট রাজনৈতিক বৈধতা প্রদান করতে পারে বটে, কিন্তু তা কখনোই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, সংসদীয় পর্যালোচনা কিংবা গণতান্ত্রিক সংলাপের বিকল্প হতে পারে না। একই সঙ্গে এটি সনদের মধ্যেই স্বীকৃত মতপার্থক্যগুলোকে অগ্রাহ্য করার সুযোগও দেয় না।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের অনেক সময় জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অবস্থান গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করতে পারে। কারণ, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানেই তার প্রতিটি প্রস্তাব বা বাস্তবায়ন পদ্ধতির প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন নয়।

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি রাজনৈতিক একরৈখিকতা নয়; বরং যুক্তিসংগত মতভিন্নতা, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং ভিন্নমতকে ধারণ করার সক্ষমতা। সেই বিবেচনায় জুলাই সনদের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। এটি যদি জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হতে চায়, তাহলে ভিন্নমতকে অস্বীকার না করে স্বীকৃতি দেওয়াই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, জাতীয় ঐকমত্য গঠনের জন্য তৈরি হওয়া এই দলিলটি ক্রমেই রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। সমালোচকদের অভিযোগ, জুলাই সনদকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে একে দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে।

বিশেষ করে সাংবিধানিক বিতর্কগুলোকে জুলাই আন্দোলনের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করার রাজনীতি স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত হবে জুলাই সনদকে প্রশ্নাতীত জাতীয় ঐকমত্যের দলিল হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে বিবেচনা করা। এতে যেমন যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য মতভেদও রয়েছে। আর এই মতভেদগুলোকে স্বীকার করাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ছিল দায়বদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাংবিধানিক কাঠামো। তারা আরেকটি রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংঘাত দেখতে চায়নি।

সবশেষে বলা যায়, জুলাই সনদ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। তবে সেটি তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে দলীয় বিজয়ের প্রতীক নয়, বরং একটি বৃহত্তর জাতীয় সংলাপের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করবে। অন্যথায়, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হওয়ার পরিবর্তে এই দলিলই নতুন রাজনৈতিক বিভাজনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 36 = 46