Friday, November 6

সাইকেল মেরামতের দোকানে বাবার সঙ্গে কাজ করেই কেটে যেত দেব মণ্ডলের দিন। ফুটবলে দারুণ প্রতিভাবান হলেও বরিশালের উজিরপুরের এই কিশোরের বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের কোনো মঞ্চ ছিল না। অবশেষে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সেই স্বপ্নকে বাস্তবের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

সরকারি উজিরপুর বারো বাইকা মডেল ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেব মণ্ডল গত মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে সেরা ক্রীড়া প্রতিভাদের তালিকায় জায়গা করে নেয়। দেবের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা শত শত খুদে ক্রীড়াবিদ এখন ভবিষ্যতের বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনছে।

তাদেরই একজন শেরপুরের রাকিব মিয়া। নিজ শহরে কোনো সুইমিংপুল না থাকলেও বাংলাদেশের হয়ে অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। রাজমিস্ত্রি বাবার সন্তান রাকিব ৫০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোক ও বাটারফ্লাই ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতে নিজের সম্ভাবনার জানান দিয়েছে।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসা এমন প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের সম্মাননা জানাতে সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর প্রথম আসরের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

‘নিজেকে গড়ে তুললেই বাংলাদেশ গড়ে উঠবে’

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “তোমরা কখনো নিজেকে ছোট ভাববে না। নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তোমাদের হাত ধরেই সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে ওঠে।”

তিনি বলেন, “তোমরা যদি আগামী দিনের জন্য নিজেদের সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে পারো, তাহলে আমরাও বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।”

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো শিশু-কিশোরের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের ডাক্তার, প্রকৌশলী, স্থপতি, ক্রিকেটার, সাঁতারু, টেনিস খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের সেরা প্রতিনিধিরা উঠে আসবে।

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের যাত্রা

‘স্বপ্নের পথে, বিজয়ের সাথে’ স্লোগানে চলতি বছরের ২ মে শুরু হয় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক উপস্থিত ছিলেন।

গণমাধ্যমকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধ

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের সাফল্য দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আজকের এই শিশুরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আমি আশা করব, আগামীকালের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের শিরোনামে তাদের গল্প উঠে আসবে।”

দেশ গড়ার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের

বাংলাদেশের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার ধীরে ধীরে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে।

তিনি শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরা যদি নিজেদের গড়ে তুলতে পারো, তাহলে আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারব।”

অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত শিশু-কিশোরদের প্রশ্ন করেন, “বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে কে কে কাজ করবে?” এ সময় হাজারো শিশু-কিশোর হাত তুলে দেশ গঠনে অংশ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।

শুধু খেলাধুলা নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধও

প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোরদের পড়াশোনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি পরিবেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, গাছ লাগানো, পরিবেশ রক্ষা এবং পশুপাখির প্রতি সদয় আচরণও একজন ভালো নাগরিকের দায়িত্ব।

এ সময় তিনি উপস্থিত প্রতিযোগীদের এসব বিষয়ে সচেতন ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি নেন।

বিজয়ীদের জন্য সরকারি সহায়তা

প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তাদের শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।

তিনি বলেন, “তোমরা গান গাইতে চাও, ছবি আঁকতে চাও কিংবা খেলাধুলা করতে চাও—সরকার তোমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করবে।”

বিজয়ীদের অভিভাবকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী এবং আশা প্রকাশ করেন, এই সাফল্য একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে।

মাঠে বসে উপভোগ করেন ফাইনাল

পুরস্কার বিতরণের আগে প্রধানমন্ত্রী মাঠের পাশে বসে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ফুটবলের ফাইনাল খেলা উপভোগ করেন।

বালক বিভাগে ময়মনসিংহ অঞ্চলকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় সিলেট। অন্যদিকে বালিকা বিভাগে রাজশাহীকে ৪-০ গোলে পরাজিত করে শিরোপা জিতে নেয় রংপুর অঞ্চল।

প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, মেডেল ও চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

উল্লেখ্য, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রথম আসরে আটটি ডিসিপ্লিনে দেশের প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার খুদে ক্রীড়াবিদ অংশ নেয়। সেখান থেকে বাছাই করা ৩১০ জন প্রতিভাবানকে দুই মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণের জন্য বিকেএসপিতে পাঠানো হবে। প্রশিক্ষণে সফলদের সরকারি খরচে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগও দেওয়া হবে।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 41 = 51