Saturday, November 7

অ্যাপে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নীতিমালা লঙ্ঘন করে সেবা পরিচালনা এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই রাইড শেয়ারিং সেবায় ভোক্তাদের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

সংস্থাটি জানিয়েছে, রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য আলাদা কোনো সেবা শ্রেণি না থাকলেও এটি পরিবহন সেবার আওতাভুক্ত। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা সেবা-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ সরাসরি কিংবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানাতে পারবেন যাত্রীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৭ সালে প্রণীত ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা’র অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বিধান আট বছরেও বাস্তবায়িত না হওয়ায় খাতটির কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রাইড শেয়ারিং সেবাকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে প্রণীত নীতিমালায় বিআরটিএর অনুমোদন, নিজস্ব কার্যালয়, নিবন্ধিত যানবাহন, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালক, ডিজিটাল লেনদেন, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং জরুরি (এসওএস) সুবিধা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়।

এ ছাড়া চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, অনলাইনে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, বিআরটিএর ওয়েব পোর্টালের সঙ্গে তথ্য সংযুক্তি, প্রতিটি যাত্রার তথ্য সংরক্ষণ, পুলিশ কন্ট্রোল রুমে জরুরি বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা, অনুমোদিত পার্কিং এবং যাত্রা শুরুর আগেই সম্ভাব্য ভাড়া জানিয়ে দেওয়ার বিধানও রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব গুরুত্বপূর্ণ শর্তের অধিকাংশই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

যাত্রীদের অভিযোগ

রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, অনেক চালক অ্যাপে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ ছাড়া গন্তব্যে যেতে চান না। আবার অনেকে অ্যাপ বন্ধ রেখে সরাসরি যাত্রী পরিবহন করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাসস্ট্যান্ডে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির জটলার কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে চালকদের অসদাচরণ, নারী যাত্রীদের হয়রানি, কার্যকর এসওএস সুবিধার অভাব এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশে সংরক্ষণের অভিযোগও রয়েছে।

চাকরিজীবী জাহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে রাইড শেয়ারিং সেবা ব্যবহার করা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই গন্তব্যে ভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দীর্ঘদিন রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত রুবেল জানান, যাত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক ঘটনার পর তার অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়। এরপর গত আট বছর ধরে তিনি অ্যাপ ব্যবহার না করে সরাসরি যাত্রী পরিবহন করছেন।

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অবস্থান

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদন্ত বিভাগের পরিচালক মো. মাসুম আরেফিন বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবা আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকলেও এটি পরিবহন সেবার আওতায় পড়ে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা জরিমানা করা হতে পারে। যাত্রীরা সরাসরি অথবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

নীতিমালা বাস্তবায়নে ঘাটতি

ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সজিব হোসেন বলেন, নীতিমালায় চালক, মালিক ও কোম্পানির মধ্যে স্ট্যাম্প পেপারে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কথা থাকলেও বাস্তবে অনলাইনের ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস’ গ্রহণের মাধ্যমেই চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে। অধিকাংশ চালক না বুঝেই এতে সম্মতি দেন।

তিনি আরও বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার দেশের বাইরে থাকায় অভিযোগের দ্রুত সমাধান হয় না। চালকদের ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় আনা, কমিশন কমানো এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হালিম তালুকদার জানান, নতুন ভাড়া কাঠামো এখনো কার্যকর না হওয়ায় কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করছে। এতে চালকদের ওপর কমিশনের চাপ বাড়ছে এবং অনেকেই অ্যাপের বাইরে ট্রিপ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিআরটিএর বক্তব্য

বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, বর্তমানে বিআরটিএর তালিকাভুক্ত ১৯টি রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে মাত্র তিন থেকে চারটি। প্রায় ৩৫ হাজার যানবাহন নিবন্ধিত রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৬ থেকে ২৭ হাজার একটি প্ল্যাটফর্মে এবং ৫ থেকে ৬ হাজার অন্য একটি প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত।

তিনি আরও জানান, অনুমোদন ছাড়া একটি আন্তর্জাতিক রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অ্যাপটি বন্ধে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। নীতিমালা না মানা বা সনদ নবায়ন না করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবা অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালার বাইরে গিয়ে পেশায় পরিণত হয়েছে। চালকদের প্রশিক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা, পার্কিং ব্যবস্থাপনা এবং বিআরটিএর তদারকির ঘাটতিই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোকে কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারা বিআরটিএর ব্যর্থতা। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের তথ্য বিদেশে সংরক্ষণের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, রাইড শেয়ারিং নীতিমালা হালনাগাদের কাজ চলছে। বিদ্যমান নীতিমালাকে সময়োপযোগী করে সেবা আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রতিযোগিতাবিরোধী কোনো আচরণ বা অপরাধের আলামত রয়েছে কি না, তা কমিশন বিচার-বিশ্লেষণ করবে।

Leave A Reply


Math Captcha
8 + 2 =