নিজস্ব প্রতিবেদক |
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নাম পরিবর্তন করে নতুন আইনের আওতায় বাহিনীটিকে বহাল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক একটি আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। প্রস্তাবিত নতুন নাম হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ)’ অথবা ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন আইন অনুযায়ী বাহিনীটি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হবে। তবে বর্তমান র্যাবের মতোই সামরিক বাহিনীসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে সদস্য প্রেষণে নেওয়ার সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে।
রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে নতুন আইনের খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, র্যাবকে কেবল নামমাত্র পুলিশের অধীনস্থ না রেখে কার্যকরভাবে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
কার্যক্রম সীমিত করার প্রস্তাব
বৈঠকে র্যাবের কার্যক্রমের ভৌগোলিক পরিধি সীমিত করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বর্তমানে সারা দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা এই বাহিনীকে কেবল মহানগর এলাকায় সীমাবদ্ধ করা যায় কি না, সে বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি অংশের মতে, মহানগর এলাকায় পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ও জনবল থাকলেও জেলা পর্যায়ে পুলিশের জনবল সংকট রয়েছে। তাই সেখানে বিশেষায়িত ইউনিটের কার্যক্রম আরও প্রয়োজন হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২৯ জুলাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সবার মতামত নিয়ে আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন আইনে যা থাকছে
প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় মোট ৯টি অধ্যায় ও ২৯টি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বাহিনীর গঠন, দায়িত্ব, তল্লাশি ও গ্রেপ্তার, ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত, সদস্যদের শৃঙ্খলা ও শাস্তি, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং র্যাবের বর্তমান সম্পদ ও সদস্যদের স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনটি কার্যকর হলে র্যাব নামটি বিলুপ্ত হবে। তবে এর সদস্য, স্থাপনা, অস্ত্র, সরঞ্জাম, চলমান মামলা, চুক্তি এবং অন্যান্য দায়-দায়িত্ব নতুন ইউনিটের অধীনে স্থানান্তরিত হবে। ফলে এটি মূলত র্যাবের বিলুপ্তি নয়, বরং নতুন নামে পুনর্গঠন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বহু বাহিনীর সদস্য রাখার সুযোগ
খসড়া অনুযায়ী, নতুন ইউনিটের মহাপরিচালক হবেন বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, যিনি সরকারের মাধ্যমে নিয়োগ পাবেন। তিনি সরকারের অনুমোদনক্রমে ইউনিটকে ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশনে বিভক্ত করতে পারবেন।
ইউনিটটির সার্বিক তত্ত্বাবধান সরকারের হাতে থাকবে এবং মহাপরিচালক পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশনায় দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসনিক, আর্থিক এবং অভিযান পরিচালনার ক্ষমতাও তার অধীন থাকবে।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী কেবল প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব খসড়ায় প্রতিফলিত হয়নি। এতে পুলিশ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী এবং অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে বা সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তদন্ত ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা
প্রস্তাবিত আইনে নতুন ইউনিটের জন্য আট ধরনের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা,
- গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ,
- অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার,
- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ,
- সন্ত্রাসবাদ দমন,
- সাইবার অপরাধ দমন,
- মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ,
- অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা এবং সরকারের নির্দেশিত দায়িত্ব পালন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। মাদক, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, মানবপাচার, সাইবার অপরাধ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে নতুন ইউনিটকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে ইউনিটটি যেকোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ করতে হবে।
অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি
খসড়ায় বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত এবং অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে কমিটির অধিকাংশ সদস্য পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কর্মকর্তা হওয়ায় এর স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
কমিটির সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক না হয়ে পরামর্শমূলক হওয়ায় অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি নিশ্চিত হবে কি না, সে বিষয়েও সংশয় রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ
র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। রাজনৈতিক দল হিসেবেও বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব দিয়েছিল।
মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান এ বিষয়ে বলেন, শুধু নাম পরিবর্তন বা পোশাক বদল করলেই র্যাবের প্রকৃত সংস্কার হবে না। বাহিনীর ক্ষমতার সীমা, কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের পেশাগত কাজ। তাই বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করতে হলে পুলিশের মধ্য থেকেই দক্ষ সদস্য বাছাই করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাহিনীটি গঠন করা উচিত। সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের নিয়মিত বেসামরিক আইন প্রয়োগের দায়িত্বে রাখলে বলপ্রয়োগ ও নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইন কার্যকর হলে বাহিনীর নাম পরিবর্তন হলেও এর ক্ষমতা ও কার্যক্রমের পরিধি অনেকাংশেই বহাল থাকবে। ফলে প্রস্তাবিত কাঠামো কতটা জবাবদিহিমূলক ও মানবাধিকারসম্মত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

