গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে দাফন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইমাম রেজা (আ.)–এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। তবে এই দাফন অনুষ্ঠানেও জনসম্মুখে দেখা যায়নি তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে। একই হামলায় তিনি গুরুতর আহত ও বিকৃত হওয়ায় এখনো নিরাপত্তাজনিত কারণে জনসমক্ষে আসেননি বলে জানা গেছে।
এক সপ্তাহব্যাপী শোক মিছিল, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। এমন এক সময় এই দাফন সম্পন্ন হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে উত্তেজনা ও সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে ইরান।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.)–এর মাজার এলাকায় হাজার হাজার শোকাহত মানুষের ঢল নামে। কালো পোশাক পরিহিত জনতা ইরানের জাতীয় পতাকা, প্রয়াত খামেনির ছবি এবং ইসলামী বিপ্লবের বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত ব্যানার হাতে শোক মিছিলে অংশ নেন। পুরো এলাকা পরিণত হয় শোকাবহ পরিবেশে।
গত এক সপ্তাহে খামেনির মরদেহ ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তেহরান, কোম, নাজাফ ও কারবালায় লাখো মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব এই শোকানুষ্ঠানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
অন্যদিকে, বাবার মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষিত মোজতবা খামেনির অবস্থান এখনো রহস্যে ঘেরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ওই হামলায় তার মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসাধীন থাকায় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তার অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে। যদিও তার পক্ষ থেকে কয়েকটি লিখিত বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।
দাফন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানেও মুখর ছিল শোকযাত্রা। বহু মানুষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আহ্বান জানিয়ে স্লোগান দেন। কারও কারও হাতে ছিল ‘Kill Trump’ লেখা প্ল্যাকার্ড। পাশাপাশি ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’—এমন নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
খামেনির সঙ্গে নিহত পরিবারের আরও চার সদস্যের মরদেহও বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে নেওয়া হয় এবং প্রতিটি স্থানেই বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। শিয়া বিশ্বাসে শাহাদাতের গুরুত্বের কারণে এই ঘটনাকে ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় ৩৭ বছরের শাসনের অবসানের মাধ্যমে ইরান নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তার মৃত্যু এবং নেতৃত্বের পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখোমুখি।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্বের অধীনে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথচলা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

