Tuesday, November 3

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেছেন, পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে বোর্ড গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি এবং সরকারের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ কয়েক সপ্তাহ আগেই নেওয়া হয়েছিল। মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নাম দিতে কয়েক দিন সময় লাগে। সর্বশেষ গত পরশু রাতে তারা প্রতিনিধির নাম দেয়। এরপর গতকাল যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে শ্রমমন্ত্রী মজুরি বোর্ড গঠন করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দিন ধরে পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থিত কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং শিগগিরই এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে আলোচনা করে যথাসম্ভব দ্রুত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও ঘোষণা করা হবে।

মজুরি নির্ধারণের সময়সীমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছর পূর্ণ হওয়ার সময় রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বোর্ড ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে মজুরি নির্ধারণ করা হবে।

শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সহিংসতার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গত কয়েক দিনে সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ ও আগুন জ্বালিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় কিছু শিল্পমালিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলেন মন্ত্রী। পাশাপাশি কিছু শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে কাজ করা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলাবিরোধী তৎপরতা এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকালও এ ধরনের কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার শিল্প, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবান্ধব। রপ্তানি বৃদ্ধি, দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমিকদের কল্যাণ ও স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা চান তিনি। সকালে মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর বিকেল ৩টায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানান মন্ত্রী।

শ্রমিক আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের বাইরের লোকজনের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিল্পমালিকদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কিছু শিল্পকারখানা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিতে মালিকপক্ষকে বলা হয়েছে। অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে—এমন শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামের তালিকাও চাওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টায় পতিত শক্তির কিছু লোক জড়িত, যারা প্রকৃত শ্রমিক নন। প্রকৃত শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা নিজেদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হোক, তা চাইবেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভুলক্রমে কেউ এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকলে তাদের সেখান থেকে সরে আসার আহ্বান জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহিংসতা ও অস্থিরতা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যারা যে উদ্দেশ্যেই অস্থিরতা সৃষ্টি করুক না কেন, সীমান্তের ওপার থেকে ইশারায় কোনো ঘৃণ্য রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা হবে।

শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয় ও শ্রমমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। শ্রমিক প্রতিনিধিদের নাম আগে পাওয়া গেলে মজুরি বোর্ডও আগে গঠন করা যেত। আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি বোঝার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। এখন বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সরকারের নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা রয়েছে। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। মালিকপক্ষও তাদের ফোকাল পয়েন্ট ঠিক করে দিয়েছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ‘সুরক্ষা অ্যাপস’ ব্যবহার করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন ও পূজাসহ বিভিন্ন সময়ে অ্যাপটি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে যেকোনো জায়গার তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান ও শেয়ার করা সম্ভব। অ্যাপটির মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কিছু শিল্পমালিকের বিরুদ্ধে অস্থিরতায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আগে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের কেউ কোনো সময় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। এসব শিল্পমালিক অস্থিরতার পেছনে কাজ করছেন—এমন তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, সরকার কোনো মিল বা শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, তা চায় না। কারণ, এর সঙ্গে শ্রমিকদের জীবিকা জড়িত। শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানানো হবে। কোনো শ্রমিক যেন কর্মহীন হয়ে না পড়েন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। বিজয় দিবস উপলক্ষে সরকারের কর্মসূচি থাকবে। পলাতক আসামিরা ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে কিছু করার চেষ্টা করলে সে বিষয়ে তাদেরই প্রশ্ন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির লোকজন যেখানেই থাকুক, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।

শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তারা যে দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, সেই দেশের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন জানানো হয়েছে। তাদের যেকোনো সময় দেশে ফিরিয়ে আনা হলে আইনের আওতায় এনে আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিসেম্বরকে ঘিরে অস্থিরতার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা পলাতক নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করার চেষ্টা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Leave A Reply


Math Captcha
9 + 1 =