Tuesday, November 3

আগামী নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরের মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া দল ও জোটগুলোকে নিয়েই এ সংলাপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য, দলগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে ঐক্য আরও সুদৃঢ় করা।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সংলাপে ১১ দলীয় জোট কিংবা অন্য কোনো দলকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা নেই। সংলাপে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা, সংবিধান সংশোধন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় সংকটে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর করণীয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

দূরত্ব কমিয়ে ঐক্য জোরদারের উদ্যোগ

বিএনপির সূত্র জানায়, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বোঝাপড়া ও সংহতি তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদের কারণে তা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে শরিক দলগুলোর দূরত্বও বেড়েছে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন দলের অবস্থান এবং রাজনৈতিক স্বার্থের ভিন্নতার প্রভাব পড়েছে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।

এ পরিস্থিতিতে শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ভুল-বোঝাবুঝি দূর করতে চান তারেক রহমান। একই সঙ্গে দলগুলোর মতামত, অভিযোগ ও প্রত্যাশার কথাও শুনতে চান তিনি।

সংলাপে আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার তৎপরতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর করণীয় কী হবে, সে বিষয়ে দলগুলোকে বার্তা দিতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের ধারণা, এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সংলাপ নিয়ে যা বলছেন বিএনপি নেতারা

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে আলোচনা হবে এবং তখন বিস্তারিত জানাতে পারবেন।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে শরিক দলগুলো বিএনপির সহযাত্রী ছিল। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তারাও হামলা-মামলার শিকার হয়েছে। এখন গণতন্ত্রের রক্ষক ও সেবক হিসেবে শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরালো করা প্রয়োজন, যাতে গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় কোনো ছেদ না পড়ে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ফ্যাসিবাদের পতন হলেও তাদের দোসররা এখনো নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করছে। এ সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই দলগুলোর দূরত্ব কমিয়ে ঐক্য ধরে রাখতে তারেক রহমান নিজেই উদ্যোগ নিচ্ছেন। আগামী দুই মাসের মধ্যে সংলাপটি হতে পারে বলে জানান তিনি।

যেভাবে হতে পারে সংলাপ

দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংলাপ আয়োজনের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বর্তমানে চিকিৎসার জন্য চীনে অবস্থান করছেন তিনি। দেশে ফেরার পর সংলাপের প্রস্তুতি ও আয়োজনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হতে পারে।

গত ২০ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত নৈশভোজের মতো বড় পরিসরে এবার নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা নেই। প্রতিটি দল থেকে দুই থেকে তিনজন, কোনো কোনো দল থেকে একজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। সব মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০ জন নেতার অংশগ্রহণে সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। আমন্ত্রণপত্র তৈরির কাজও চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সংলাপটি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনা অথবা রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

শরিকদের মূল্যায়ন নিয়ে অসন্তোষ

২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া আওয়ামী লীগবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৪২টি রাজনৈতিক দল সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এসব দলের কয়েকটি ২০০৮ সাল থেকেই বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত। আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে শরিক দলের নেতাকর্মীরাও মামলা, হামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না পাওয়ায় পুরোনো শরিকদের অনেকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে থাকার পরও নতুন মিত্রদের তুলনায় তারা কম গুরুত্ব পাচ্ছেন।

বিশেষ করে গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও এনডিএম থেকে একজন করে প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর গত ২০ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এক নৈশভোজে শরিকদের যোগ্যতা অনুযায়ী যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন তারেক রহমান। তবে সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করছেন কয়েকটি দলের নেতারা।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অবশ্য বলেন, শরিকদের কিছু ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে বিএনপির যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও জোটের স্বার্থে শরিক দলের নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তাদের কেউ মন্ত্রী হয়েছেন, আবার কাউকে বিশেষ সহকারী করা হয়েছে। বাকি শরিকদের বিষয়েও তারেক রহমানের ইতিবাচক চিন্তাভাবনা রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে তাদের মূল্যায়ন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শরিক দলগুলোর প্রত্যাশা

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিএনপি ও সরকারের সঙ্গে শরিক দলগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘদিন ধরে চলছে। সরকার গঠনের পর তা আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম বোঝাপড়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ৩১ দফা রূপরেখা বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদ কার্যকর করা গেলে দেশ ও জনগণের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে। সরকারপ্রধান সংলাপের উদ্যোগ নিলে সেটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ন্যাশনাল লেবার পার্টির চেয়ারম্যান লায়ন মো. ফারুক রহমান সংলাপের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ১২ দলীয় জোটে যোগ্য নেতা থাকা সত্ত্বেও তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। শরিক দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়নের পাশাপাশি নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি চেয়ারম্যানের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চান তারা।

জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত বলেন, সংলাপের বিষয়ে তারাও শুনেছেন, তবে এখনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। সংলাপে জুলাই সনদের যুক্তিসংগত বিষয়গুলো তুলে ধরবেন তারা। দেশের জনগণের স্বার্থে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় জুলাই সনদ ও ৩১ দফার আলোকে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাবেন বলেও জানান তিনি।

সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত সংলাপের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব কমানো, পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। তবে সংলাপের চূড়ান্ত তারিখ, অংশগ্রহণকারী দলগুলোর তালিকা ও আলোচ্যসূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

Leave A Reply


Math Captcha
93 − 83 =