Monday, October 19

কিশোর গ্যাং দমনে দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত দেড় মাসে সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হলেও পাড়া-মহল্লায় তাদের দৌরাত্ম্য কমছে না। উল্টো গ্রেপ্তার কিশোরদের চাপে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বেকারত্ব, মাদকের বিস্তার এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর উদ্যোগও জোরদার করা জরুরি।

আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে যেসব জায়গায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেসব জায়গায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কিছু ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাং গড়ে উঠছে। কিন্তু এসব গ্যাংয়ের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি বা আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বড় একটি অংশ প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে আসে। বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব ও মাদকের বিস্তারের মতো সামাজিক সংকট দূর না করে শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা কঠিন।

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে। কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ৩০০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে রয়েছে ৬৯৩ জন। অন্যদিকে, যশোরের পুলেরহাট শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ১৫০ জনের জায়গায় বন্দি রয়েছে ৩০৩ জন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর গ্যাং সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের কিশোর গ্যাংয়ের প্রেক্ষাপটে পার্থক্য রয়েছে। দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও মাদকের প্রভাবসহ নানা কারণে কিশোরদের বিভিন্ন দল গড়ে উঠছে। পাশাপাশি মিছিল-মিটিং ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও দায়ী

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বস্তিকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি। মোহাম্মদপুর, উত্তরা, টঙ্গী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশের তালিকায় দেড় শতাধিক কিশোর অপরাধী গ্রুপের নাম রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দিন দিন এ সংখ্যা বাড়ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এসব কিশোরের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। পাশাপাশি ফেসবুক ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও কিশোরদের অপরাধী গোষ্ঠীর প্রতি আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশোধনাগার থেকে ফিরেও অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকি

পুলিশি অভিযানে কিশোরদের আটক বা গ্রেপ্তার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং, দক্ষ জনবল ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ, সংশোধনাগার থেকে মুক্তির পর অনেক কিশোরই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। কেউ কেউ আবার চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে; কারও ক্ষেত্রে অপরাধজগতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সমাধানে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা জরুরি

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোর গ্যাং সমস্যা মোকাবিলায় পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং অবসর সময় কীভাবে কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে কিশোরদের মনোজগৎ বুঝতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোরেরা স্বাভাবিকভাবেই আবেগপ্রবণ থাকে এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা সহজে প্রভাবিত হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা কিংবা মহল্লার প্রভাবশালী বড় ভাইদের মতো ক্ষমতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা থেকেও কেউ কেউ গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক নেতা ও অপরাধীচক্র কিশোরদের এই মানসিকতার সুযোগ নেয়। হুজুগ, হতাশা ও বেকারত্বের কারণেও অনেকে অপরাধীচক্র কিংবা মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই শুধু পুলিশের ভয় দেখিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা কঠিন।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ১৮ বছরের কম বয়সীরা আইনের চোখে শিশু। ফলে কিশোরদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে শিশু আইন ও সংশ্লিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

পুলিশের সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কমবেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। তবে এ সমস্যা প্রতিরোধে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগও নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গ্যাংয়ের পেছনে থাকা আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত করা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ পথ।

Leave A Reply


Math Captcha
7 + 2 =