Saturday, April 18

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন চললেও বাস্তবে খাল খনন ও বর্জ্য পরিষ্কার না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন খাল ঘুরে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও অধিকাংশ স্থানে খনন বা বর্জ্য অপসারণের দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ নেই। ফলে বর্ষা এলেই আবারও জলাবদ্ধতার শঙ্কায় নগরবাসী।

চট্টগ্রাম নগরে মোট খালের সংখ্যা ৫৭টি। এর মধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনের বড় প্রকল্পগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৩৬টি খাল। বাকি ২১টি খাল সংস্কারের বাইরে রেখেই তিন সংস্থা চারটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করে, যার মোট ব্যয় প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাকি খালগুলো পরিষ্কারের জন্য সরকার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে কর্নেলহাট এলাকার সরোজিনী এলাকায় দেখা যায়, রাইসা কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান শায়েরপাড়া খাল, ছড়ার খাল ও নাজির খালের বর্জ্য অপসারণ ও খননের দায়িত্ব পায়। এই তিন খালের জন্য বরাদ্দ ছিল এক কোটি ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। কিন্তু খালগুলোতে পলিথিন, ময়লা ও পলিতে ভরাট অবস্থাই দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সামান্য কিছু ময়লা তুলে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, “খাল পরিষ্কারের কথা শুনে আমরা ভেবেছিলাম পুরো খাল খনন হবে। কিন্তু কয়েকদিন শ্রমিক এসে সামান্য কাজ করে চলে গেছে। এরপর আর কোনো কাজ হয়নি। অথচ শুনছি বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে বাকলিয়া এলাকায় রসুলবাগ, গুলজার খান ও বড়পোল এলাকার খাল পরিষ্কার ও খননের দায়িত্ব পায় শিরোপা ট্রেডার্স। এসব খালের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় তিন কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সরেজমিনে দেখা যায়, খালের বিভিন্ন অংশ পলিতে ভরাট এবং কোথাও বড় ধরনের খননের চিহ্ন নেই। স্থানীয়রা জানান, মাঝে মাঝে কিছু শ্রমিক এসে ছবি তুলে চলে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহনাজ বেগম বলেন, “প্রতিবছর শুনি খাল পরিষ্কার হয়েছে, কিন্তু বর্ষা এলেই পানি ঘরে ঢুকে যায়। কাজ না করেই টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয়।” শহিদুল ইসলাম বলেন, “খালগুলো আগের মতোই আছে। কোথাও খনন হয়নি। তদন্ত হওয়া দরকার।”

অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মুজিব বলেন, খাল খননের কাজ একবার করলেই শেষ হয়ে যায় না। প্রতি বছরই নতুন করে পলি জমে। তিনি দাবি করেন, ২০২৫ সালে কাজ করা হয়েছে এবং কাজের ছবি, ভিডিও ও কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরই বিল নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ২৩টি খাল পরিষ্কারের দায়িত্ব ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব খালের অনেকগুলোতেই বাস্তবে কাজ না করেই দশ কোটি টাকার বেশি বিল উত্তোলন করা হয়েছে। নিয়মিত খনন না হওয়ায় খালগুলোতে জমে আছে ময়লা, পলিথিন ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি। বর্ষা মৌসুমে এসব খাল উপচে পড়ে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।

এ বিষয়ে পরিচ্ছন্নতা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দীন রিফাতের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তিন সংস্থা। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রায় ১৪ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর কাজ ৫ থেকে ১১ বছর ধরে চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। গত ১০ বছরে খাল-নালায় পড়ে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নগরবাসীর প্রশ্ন—খাল খনন ও বর্জ্য পরিষ্কার না হলে কোটি কোটি টাকার বিল গেল কোথায়? জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তব উন্নতি না হওয়ায় তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

Leave A Reply


Math Captcha
75 − 71 =