বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আলোচিত একটি শব্দ ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সরকারবিরোধী কর্মসূচি এবং ডিসেম্বরের মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের নানা বক্তব্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন, সর্বত্রই ঘুরেফিরে প্রশ্ন উঠছে, ডিসেম্বর ঘিরে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে?
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য ও নানা বিশ্লেষণের সঙ্গে ছড়াচ্ছে নানা ধরনের গুজবও। ফলে বছরের শেষ মাসকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
হাসিনার ফেরার ঘোষণা, প্রশ্ন ট্রাভেল পাস নিয়ে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তার দলের নেতাকর্মীদেরও দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তার দেশে ফেরার বাস্তব প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কারণ, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে। ফলে বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে হলে ট্রাভেল পাস বা সংশ্লিষ্ট কোনো ভ্রমণ নথির প্রয়োজন হতে পারে।
দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনা এখনো ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেননি। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তার পক্ষ থেকে কোনো আবেদন করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত নয়।
ট্রাভেল পাস সাধারণত বিদেশে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফেরার জন্য দেওয়া একটি সীমিত মেয়াদের ভ্রমণ দলিল। এটি পাসপোর্টের পূর্ণ বিকল্প নয় এবং সাধারণত নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেয়।
ফলে শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে চাইলে তার ভ্রমণ নথি, ভারতের অবস্থান এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভারত কি তাকে ফেরত পাঠাবে?
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় প্রশ্ন ভারতের অবস্থান। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ফেরত চাওয়ার কথা জানানো হলেও ভারত এখন পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানায়নি।
ভারত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ করবে, নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থায় তিনি দেশে ফিরবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সেগুলোর সবকটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সরকারি নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরতে চাইলে তার প্রবেশের আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসবে, এ বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনা আরও বাড়তে পারে।
মৃত্যুদণ্ড ও আপিলের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড এবং আপিলের সুযোগের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনা আপিল না করায় বর্তমানে তার সামনে আপিলের সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ২১ ধারায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়।
তবে এ বিষয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, শেখ হাসিনা আপিল করার উদ্যোগ নিতে পারেন, তবে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের বিষয়।
অন্যদিকে আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেনের মতে, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে বিলম্ব মার্জনার আবেদন করার সুযোগ নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত চাওয়া যেতে পারে।
অর্থাৎ আপিলের সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে কি না, কিংবা বিলম্বের আবেদন আদালত কীভাবে বিবেচনা করবেন, সেটি শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়।
দেশে ফিরলে কী হবে?
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। তার বিরুদ্ধে সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলে সরকারি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এক অনুষ্ঠানে অরাজকতা সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে দেশের আইনে ব্যবস্থা রয়েছে এবং জনগণের নির্বাচিত সরকার হিসেবে সবাইকে নিজেদের সীমার মধ্যে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
ফলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে একদিকে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া, অন্যদিকে তার নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ডিসেম্বরের ডেডলাইন ঘিরে বিরোধীদের আন্দোলন
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনার পাশাপাশি ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের কর্মসূচিও রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়াচ্ছে।
গণভোট বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্য কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এরই মধ্যে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করেছে জোটটি। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখেও লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে।
জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ছয় দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে এবং সরকার দাবি না মানলে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের আন্দোলন সফল করে ঘরে ফেরার কথা।
পরবর্তী সময়ে জোটের ছয় দফাকে এক দফা অর্থাৎ সরকার পতনের দাবিতে রূপ দেওয়ার কথাও সামনে এসেছে।
বিএনপির অভিযোগ, জামায়াতের জবাব
বিরোধী জোটের ডিসেম্বরকেন্দ্রিক আন্দোলনকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার অংশ হিসেবে দেখছে বিএনপির একটি অংশ।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি অভিযোগ করেছেন, বিরোধী দলগুলোর বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগসূত্র থাকতে পারে। অতীতে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গও তিনি টেনে এনেছেন।
তবে এ অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, ১৯৮৬ সালে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো জোট করেনি। তিনি বলেন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আলাদা কৌশল থাকলেও জামায়াত সংসদে গিয়ে আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছিল।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কোনো জোট না থাকার দাবি করে তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আন্দোলন ও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যোগাযোগ বা সমন্বয় থাকতেই পারে, তবে সেটিকে জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অলি আহমদের বক্তব্যেও ডিসেম্বর
ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাবেক চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের বক্তব্যও। তিনি বলেছেন, মানুষের মুখে মুখে উঠেছে যে ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পড়ে যাবে।
এ ধরনের বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে, ডিসেম্বর কি কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির সময়সীমা, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে?
তবে এখন পর্যন্ত ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পরিবর্তন বা বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক রূপরেখা প্রকাশ্যে আসেনি।
১৯৮৬ ও ১৯৯৬-এর প্রসঙ্গ কেন আসছে?
বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় বারবার ফিরে আসছে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের প্রসঙ্গ। এর কারণ, ওই সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক সমীকরণ ও আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তিত হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বক্তব্যে সেই ইতিহাস টেনে আনা হচ্ছে। তবে অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি মিল রয়েছে কি না, তা নির্ধারণের সময় এখনো আসেনি।
ডিসেম্বরের রাজনীতি কতটা উত্তপ্ত হবে?
সবকিছু মিলিয়ে ডিসেম্বরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একই সময়ে সামনে এসেছে। একদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে থাকা দণ্ড ও আইনি প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাভেল পাস ও ভারতের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সরকারবিরোধী আন্দোলন, ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের বক্তব্য এবং বিএনপির পাল্টা অভিযোগ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
তবে রাজনৈতিক বক্তব্য, দলীয় দাবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। শেখ হাসিনা আদৌ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কোন প্রক্রিয়ায় ফিরবেন, ভারত কী অবস্থান নেবে এবং বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন কোন পর্যায়ে যাবে, তার অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক ও আইনি developments-এর ওপর।
তাই ডিসেম্বর এখন শুধু একটি মাস নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন, সংঘাত ও নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনার একটি কেন্দ্রবিন্দু। শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি রাজনৈতিক উত্তাপ কেবল বক্তব্য ও জল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তার উত্তর দেবে সময়ই।

