Friday, November 6

পদ্মা নদীর ওপর আরও একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এর নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা চালানোর পাশাপাশি অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ, অর্থায়ন ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য অর্থায়ন নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও ঋণদাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিবিএ জানিয়েছে, চীন দ্বিতীয় পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দিক থেকে প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, বড় প্রকল্পে ঋণ নিশ্চিত করতে সাধারণত তিন থেকে ছয় বছর সময় লাগতে পারে। তবে বর্তমান গতিতে কাজ এগোলে তিন বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হতে পারে।

সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য চারটি সম্ভাব্য পথ নিয়ে সমীক্ষা করেছিল। এগুলো হলো—মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া থেকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, ঢাকার দোহার থেকে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন, মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা এবং চাঁদপুর থেকে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ।

নদীর গতিপ্রকৃতি, ভবিষ্যৎ যান চলাচল, সড়ক যোগাযোগ, প্রকৌশলগত সম্ভাব্যতা, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ ও মাওয়া-জাজিরা পথকে পরবর্তী সমীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মাওয়া-জাজিরা পথেই নির্মিত হয় বর্তমান পদ্মা সেতু।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আগের সমীক্ষার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন করে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া অংশও বিবেচনায় এসেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ সমীক্ষার জন্য সাড়ে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

একাধিক অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা

বিবিএর তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর জন্য অন্তত তিন ধরনের অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে একটি ধারণায় ‘ওয়াই’ আকৃতির সেতুর মাধ্যমে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও পাবনাকে তিন প্রান্তে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে। এতে সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার হতে পারে।

এ ছাড়া উল্টো ‘সেভেন’ আকৃতির অ্যালাইনমেন্টের মাধ্যমে তিন জেলাকে যুক্ত করার ধারণাও রয়েছে। অন্যদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া অংশে সেতুর দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে রাখা সম্ভব হলে প্রকল্পের ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট, নকশা ও রেলসংযোগের বিষয়টি সমীক্ষার ফল এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

অর্থায়ন নিয়ে আগাম আলোচনা

সাধারণত বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রাক-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি), অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি এবং একনেকের অনুমোদনসহ বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে। অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিত নকশা, পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগ, ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি শেষে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়।

সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগে। তবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পাশাপাশি অর্থায়ন নিয়েও আগাম আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে কয়েকটি কাজ একই সময়ে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

রেললাইন রাখার সুপারিশ

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এলাকায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় রেলসংযোগ অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে সেতু বিভাগকে চিঠি দিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছে তারা।

রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, পদ্মার ওপর দ্বিতীয় সেতু নির্মিত হলে তাতে রেললাইন যুক্ত করার পক্ষে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এতে ভবিষ্যতে রেলপথ আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত

দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, বড় প্রকল্প শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়। একটি সেতুর সুফল পেতে হলে এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক অবকাঠামোও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে।

নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাতও প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সতর্কতার কথা বলেছেন। তার মতে, পদ্মার বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং একটি নতুন সেতু নির্মাণে নদীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আগে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নতুন সেতুর কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশে কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি।

ব্যয় ও সম্ভাব্য সুফল

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পথে আগের একটি সমীক্ষায় সেতুটির সম্ভাব্য দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার, প্রস্থ ১৮ দশমিক ১ মিটার এবং দুই প্রান্তে সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার ধরা হয়েছিল। নদীশাসনের কাজ দুই প্রান্তে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার করার প্রস্তাব ছিল। ওই সমীক্ষায় প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের একাংশ এবং যশোরের সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেতুতে রেললাইন যুক্ত করা হলে এ অঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

পদ্মার ওপর প্রথম বড় সেতু হিসেবে লালন শাহ সেতু নির্মিত হয়। ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি ২০০৪ সালের ১৮ মে উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন করা হয় মাওয়া-জাজিরা প্রান্তের পদ্মা সেতু।

এখন দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই, অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ ও অর্থায়নের আলোচনা একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করবে সমীক্ষার ফল, অর্থায়ন এবং সরকারের পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

Leave A Reply


Math Captcha
33 − 23 =