‘ফুল ফান্ডেড’ বৃত্তিতে টিউশন-আবাসন, নেই জীবনযাত্রার খরচ: প্রশ্নের মুখে নলেজ করিডর
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায় ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডর’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের ঢাকা সফরের সময় ঘোষিত এ উদ্যোগের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০০টি বৃত্তি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নলেজ করিডরের প্রথম ধাপে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন। দ্বিতীয় ধাপও ২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকায় চালু করা হয়।
তবে দ্বিতীয় ধাপে মাস্টার্সে নির্বাচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী বৃত্তির সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, শুরুতে বৃত্তিটিকে ‘ফুললি ফান্ডেড’ বা সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে প্রচার করা হলেও অফার লেটারে টিউশন ফি মওকুফ ও আবাসন সুবিধার বাইরে জীবনযাত্রার বিভিন্ন ব্যয়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নেই।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা, খাবারের খরচ, যাতায়াত ও বিমানভাড়ার সুবিধা তারা পাচ্ছেন না। কিছু শিক্ষার্থীর দাবি, ভিসা ফি, স্বাস্থ্যবীমা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও তাদের নিজেদের বহন করতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও প্রচারে বৃত্তিটিকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু অফার লেটার হাতে পাওয়ার পর তারা জানতে পারেন, সুযোগ-সুবিধার পরিধি প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।
আরেক শিক্ষার্থী জানান, তার অফার লেটারে টিউশন ফি ও আবাসনের সুবিধা রয়েছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, ভিসা ফি, চিকিৎসা বীমা ও অন্যান্য খরচের দায়িত্ব শিক্ষার্থীর ওপর রাখা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তি বলতে আসলে কী কী সুবিধা বোঝানো হয়েছে এবং প্রচারিত সুবিধার সঙ্গে বর্তমান অফার লেটারের পার্থক্য কেন তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নলেজ করিডরকে ৫০০টি ‘fully funded scholarship’ দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন।
এদিকে ২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর মাধ্যমে নলেজ করিডরের দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হয়। পাকিস্তান হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এতে ২০টি পাকিস্তানি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তির সুযোগ তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটেও পাকিস্তানের COMSATS University, Islamabad-এর পক্ষ থেকে ওআইসি সদস্যরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীদের জন্য মাস্টার্স ও পিএইচডি বৃত্তির ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে।
এর বাইরে পাকিস্তান সরকারের Pakistan Technical Assistance Program (PTAP)-এর আওতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বৃত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ কর্মসূচির আওতায় পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিচ্ছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠানোর বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য মূল উদ্বেগ এখন বৃত্তির প্রকৃত আর্থিক কাভারেজ নিয়ে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু টিউশন ফি ও আবাসন নয়, খাবার, স্থানীয় যাতায়াত, ভিসা, স্বাস্থ্যবীমা এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াতের মতো খরচও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বৃত্তির আওতায় কোন কোন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত—তা স্পষ্টভাবে জানানো না হলে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের দাবি, পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বৃত্তির সুযোগ-সুবিধার পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং ‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তির সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হোক। এতে আবেদনকারী ও নির্বাচিত শিক্ষার্থী—উভয় পক্ষের বিভ্রান্তি দূর হবে।
