Saturday, October 17

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে দুই দফা গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে মামলাটি নথিভুক্ত করে পুলিশ। এতে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নিহত শামীমের বড় ভাই জলিল সানা বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলাটি করেন। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শহীন বলেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীমকে দুই দফা গণপিটুনি দেওয়া হয়। এতে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

হাসপাতালে গিয়েও হামলা

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যার আগে দেবহাটার কুলিয়া এলাকায় গ্রাম্য চিকিৎসক সবুরের চেম্বারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীমের ওপর প্রথম দফায় হামলা হয়। বিষপান করে অসুস্থ হওয়ার পর তিনি সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

ওসি এইচ এম শহীন বলেন, রাত ৯টার দিকে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে একটি মিছিল নিয়ে লোকজন হাসপাতালে পৌঁছায়। সেখানে শামীমের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত ও গ্রেপ্তার অভিযানের স্বার্থে আপাতত সব আসামির পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। মামলায় ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তিকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ, তিনি ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করে শামীমের বিরুদ্ধে লোকজনকে জড়ো হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা

স্থানীয়দের ভাষ্য, শামীমের কথাবার্তার একটি অডিও রেকর্ড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ইসলাম ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই কিংবা এ-সংক্রান্ত কোনো বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা ফজলুল হক আমিনী দাবি করেন, শামীম ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন। তাঁর বক্তব্যে গণপিটুনির ঘটনাকে সমর্থন করার ভাষাও ছিল।

পরিবারের দাবি, শামীম অসুস্থ ছিলেন

নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের মৃত শামছুর রহমানের ছেলে। তাঁর ছোট ভাই সাগর সানা বলেন, শামীম মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তাঁর দুই সন্তান রয়েছে।

সাগরের দাবি, পারিবারিক সমস্যার কারণে শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কখনো স্বাভাবিক থাকলেও কখনো অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা বলতেন এবং ওষুধ সেবন করছিলেন।

তিনি বলেন, শামীমের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার সময় বলা কথার রেকর্ড কেউ ধারণ করে ছড়িয়ে দেন। এরপর লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঝগড়ার পর শামীম বিষপান করেছিলেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে চেম্বারে, পরে হাসপাতালে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়।

সাগর প্রশ্ন তোলেন, শামীম কোনো অন্যায় করে থাকলেও তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা যেত। এভাবে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।

ঘটনাটি ঘিরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রেকর্ড এবং দুই দফা হামলার বিষয়ে তদন্ত চলছে। মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ উদ্‌ঘাটনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Leave A Reply


Math Captcha
6 + 4 =