চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ের হাজীপাড়ায় ইট-বালুর ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছোট সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তদন্তে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হত্যায় ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে হাজীপাড়ার একটি চায়ের দোকানের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রায় দুই বছর পর চান্দগাঁও থানা-পুলিশ সম্প্রতি চট্টগ্রাম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
পুলিশের তদন্ত ও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন কালো রঙের একটি নোহা মাইক্রোবাসে করে কয়েকজন যুবক সেখানে আসেন। তাঁদের কাঁধে থাকা ব্যাগ থেকে অস্ত্র বের করে দোকানের সামনে বসে থাকা আফতাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পরে আরও কয়েক মিনিট ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
নিহত আফতাবের বয়স ছিল ২৭ বছর। তিনি চান্দগাঁওয়ের হাজীপাড়ার বাসিন্দা মো. মুসার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সিসিটিভি ফুটেজে হামলার দৃশ্য
অভিযোগপত্রের সঙ্গে দেওয়া সিসিটিভি ফুটেজের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে হাজীপাড়ার ওমর ফারুকের চায়ের দোকানের সামনে কালো রঙের নোহা মাইক্রোবাসটি এসে থামে। তখন সড়কে অটোরিকশা ও রিকশা চলছিল। আশপাশের দোকান ও বাড়িঘরেও লোকজন ছিলেন।
কয়েক মিনিট পর মাইক্রোবাস থেকে পাঁচ-ছয়জন যুবক নেমে ব্যাগ থেকে অস্ত্র বের করেন। এরপর দোকানের সামনে বসে থাকা আফতাবকে লক্ষ্য করে গুলি চালান তাঁরা। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আফতাবের ঊরু ও পায়ে চারটি গুলি লাগে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, আফতাবের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকেন। আট থেকে দশ মিনিট ধরে গুলি চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার পর তাঁরা মাইক্রোবাসে করে চলে যান।
মামলার এক প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় দোকানদার প্রথম আলোকে বলেন, হামলাকারীদের হাতে অস্ত্র দেখে এবং গুলির শব্দ শুনে ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেননি। যাতে কেউ তাঁদের ধাওয়া করতে না পারেন, সে জন্য চলে যাওয়ার সময়ও তাঁরা ফাঁকা গুলি ছোড়েন।
ছোট সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনসহ ১১ আসামি
পুলিশের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছোট সাজ্জাদের নেতৃত্বে ১১ জন আফতাব হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। অন্য আসামিরা হলেন মো. হাসান, মোহাম্মদ ওরফে ভাতিজা মোহাম্মদ, খোরশেদ আলম চৌধুরী, মো. হেলাল, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন, বোরহান উদ্দিন, ইলিয়াস হোসেন, মো. এমরান, শিহাব উদ্দিন ও সাইফুল ইসলাম।
আসামিদের মধ্যে বোরহান উদ্দিন ও মোহাম্মদ জামিনে রয়েছেন। অন্যরা কারাগারে আছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৯ জুলাই যশোর হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তদন্তে পুলিশের দাবি, ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর দলের নেতৃত্ব দেন ডেভিড ইমন। সাজ্জাদের নির্দেশে মুঠোফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়া হতো। চাঁদা না পেলে নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটত। চাঁদার টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হতো বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে বড় সাজ্জাদ প্রথম আলোকে বলেন, আফতাব হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। তাঁর এক আত্মীয়কেও এ মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
পুলিশের অভিযোগপত্রে আফতাব হত্যার পেছনে ইট-বালুর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের বিরোধকে দায়ী করা হয়েছে।
আফতাবের পরিবারের সদস্যদের দাবি, সন্ত্রাসী সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন আফতাব। ইট-বালুর ব্যবসা করতে গেলেও তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হতো। এ নিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই মাস আগে তাঁরা আদালতে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। তবে পরিবারের অভিযোগ, সে সময় পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে শটগানের কার্তুজ উদ্ধার করে পুলিশ। সেগুলোর ব্যালিস্টিক পরীক্ষা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরীক্ষায় কার্তুজগুলো ১২ বোরের শটগানের বলে মত দেন সিআইডির চট্টগ্রামের ব্যালিস্টিক বিশারদ শাকেরুল আলম।
মামলায় ছোট সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনসহ গ্রেপ্তার আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে আসামিদের অস্ত্র হাতে দেখা গেলেও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদেও আসামিরা অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য দেননি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলাটির তদন্ত করেছেন চারজন উপপরিদর্শক (এসআই)। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এজাহারের বাইরে তদন্তে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদেরও আসামি করা হয়েছে।
নিহত আফতাবের বাবা ও মামলার বাদী মো. মুসা নগরের জুবিলী রোড এলাকার একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘ সময়েও তদন্ত শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বারবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন, কিন্তু একটি অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। তাঁর প্রশ্ন, এ অবস্থায় বিচার কীভাবে হবে?
ভয়ে আছেন কি না, জানতে চাইলে এ বিষয়ে আর কিছু বলতে রাজি হননি মুসা।

