শরতের আকাশে উৎসবের রং। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গাকে বরণের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কোথাও প্রতিমায় রং-তুলির শেষ আঁচড়, কোথাও চলছে আলোকসজ্জা ও মণ্ডপ-তোরণ সাজানোর কাজ। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠার অপেক্ষায় মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলো।
গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে আবাহন করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বোধন সম্পন্ন হয়েছে। আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠীর পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
মহাষষ্ঠীতে শুরু মূল আনুষ্ঠানিকতা
তিথি অনুযায়ী, আজ মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তদের প্রার্থনা, পূজা-অর্চনা ও নানা আয়োজনে মুখর হয়ে উঠবে মণ্ডপগুলো। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় দেবীর আরাধনায় মিলিত হবেন ভক্তরা।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়। তবে এবার মহাসপ্তমীর তিথি দুই দিন পড়ায় পূজার আনুষ্ঠানিকতা ছয় দিন ধরে চলবে।
সূচি অনুযায়ী, শনিবার মহাসপ্তমী, রোববার অধিক তিথিতে মহাসপ্তমীর পূজা, সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় ঘোড়ায় আগমনকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক অস্থিরতা, যুদ্ধবিগ্রহ ও শস্যহানির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে নৌকায় গমনকে শস্যবৃদ্ধি ও জলপ্লাবনের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ঢাকায় মণ্ডপের সংখ্যা কমেছে
সারা দেশে মণ্ডপের সংখ্যা বাড়লেও ঢাকা মহানগরীতে এবার কিছুটা কমেছে। গত বছর রাজধানীতে ২৬১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার হচ্ছে ২৫৮টিতে। রাস্তার ওপর পূজার আয়োজনের অনুমতি না পাওয়ায় মণ্ডপের সংখ্যা তিনটি কমেছে।
সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা সাজানো ও রং করার কাজ চলছে শেষ মুহূর্তে। কাদামাটির প্রলেপের ওপর রং-তুলির আঁচড়ে ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে দেবীর প্রতিমা। পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, বর্ণিল তোরণ নির্মাণ এবং ফেস্টুন-ব্যানার লাগানোর কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকরা।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ওপরও তৈরি করা হয়েছে পূজামণ্ডপ। উৎসবকে ঘিরে পূজা কমিটির সদস্যদের মধ্যে চলছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা। ষষ্ঠীর পূজার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হচ্ছেন ভক্তরা।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হচ্ছে। সেখানে পূজা-অর্চনার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা ও বিজয়া শোভাযাত্রার আয়োজন রয়েছে।
নিরাপত্তায় মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনে সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, আনসার, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)সহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকরাও নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবেন।
সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ১ হাজার ৮০০ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। সীমান্তের দুর্গম এলাকা এবং বিজিবির বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) থেকে দূরে অবস্থিত মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় ১৮টি বেসক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় এসআরবির ১৫টি ব্যাটালিয়নের ৬ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সড়কে প্রতিদিন ৫৪৯টি পিকআপ ও ৪৪৭টি মোটরসাইকেলে টহল দেওয়া হচ্ছে। নাশকতা বা সন্দেহজনক তৎপরতা মোকাবিলায় ডগ স্কোয়াড ও বম্ব ডিসপোজাল টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বিভাগীয় শহরগুলোতেও বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। মহানগর এলাকার পূজামণ্ডপগুলোতে বাড়তি নজরদারি ও পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত মণ্ডপ পরিদর্শন করছেন।
২ লাখ ১২ হাজার আনসার-ভিডিপি সদস্য দায়িত্বে
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সারা দেশে ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৮৮ জন পুরুষ এবং ৬৬ হাজার ৩৩০ জন নারী সদস্য রয়েছেন।
১৫ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তারা দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালন করবেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০৪টি স্ট্রাইকিং ফোর্স টিমের ৬২৪ সদস্যকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা কার্যক্রমে জনবল মোতায়েনের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পূজায় বিশেষ বাস সার্ভিস বিআরটিসির
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো ‘দুর্গাপূজা বিশেষ বাস সার্ভিস’ চালু করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিশেষ বাস সার্ভিস পরিচালনা করা হবে।
এ জন্য ২০০টি বাস প্রস্তুত রেখেছে রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থাটি। যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে বিআরটিসির ২২টি বাস ডিপো থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রির কথা জানানো হয়েছে।
রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুর থেকে রংপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পাবনা, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, নওগাঁ, পঞ্চগড়, ভূরুঙ্গামারী, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বরিশাল, খুলনা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন গন্তব্যে বাস চলাচল করবে।
এ ছাড়া মতিঝিল আন্তর্জাতিক বাস ডিপো, ফুলবাড়িয়া সিবিএস-২, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, গাজীপুর চৌরাস্তা, চন্দ্রা মোড় ও মহাখালী বাস টার্মিনালে ৬০টি বাস প্রস্তুত রাখা হবে।
পাঁচ দিনের ছুটি
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি থাকছে।
বোধন থেকে বিজয়া
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তকালে এ পূজা আয়োজন করা হয়েছিল বলে তা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। অন্যদিকে, রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্র শরৎকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। শরৎকালের এ আয়োজনকে বলা হয় অকাল বোধন।
দুর্গাপূজার অন্যতম আচার বোধন। বোধন শব্দের অর্থ জাগরণ বা চৈতন্যপ্রাপ্তি। পূজা শুরুর আগে সন্ধ্যায় বেলশাখায় দেবীর বোধন করা হয়। বাঙালির লোকবিশ্বাসে দেবী দুর্গা প্রতি বছর কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসেন কন্যারূপে, যেন বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা এক মেয়ে। তাই দেবীকে বরণ করে নিতে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় নানা আচার-অনুষ্ঠানের।
আজ মহাষষ্ঠীর পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে মূল উৎসব। পূজা, প্রার্থনা ও নানা আনুষ্ঠানিকতার পর আগামী বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।

